সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

আমাদের জীবনে গীতা

 


গীতা জ্ঞান সম্পর্কে অনাদি কাল থেকে বহু ভাষ্য ও উপাখ্যান লেখা হয়ে চলেছে; আজ ওই কাজে অনেক সাধক, অধ্যাপক ও অভ্যাসই লেগে আছেন।  যতই লেখা হোক না কেন প্রত্যেক বার কিছু না কিছু নতুনত্ব নিয়ে ভাষ্য উপপস্থাপিত হয় ও আমাদের কাছে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।  

মঙ্গলাচরণ

 


ওঁ তৎ সৎ 

    অথ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা প্রারভ্যতে

     শ্রীগোপালকৃষ্ণায় নমঃ 

         ওঁ অস্য শ্রীমদ্ভগবদ্গীতামালামন্ত্রস্য শ্রীভগবান্ বেদব্যাসঃ ঋষিঃ অনুষ্টুপ্ ছন্দঃ শ্রীকৃষ্ণঃ পরমাত্মা দেবতা অশোচ্যানন্বশোচস্ত্বং প্রজ্ঞাবাদাংশ্চ ভাষসে ইতি বীজং, সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং ব্রজেতি শক্তিঃ, অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ইতি কীলকম্৷ নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ইত্যঙ্গুষ্ঠাভ্যাং নমঃ৷ ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ইতি তর্জনীভ্যাং নমঃ৷ অচ্ছেদ্যোহয়মদাহ্যোহয়মক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ ইতি মধ্যমাভ্যাং নমঃ। নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোহয়ং সনাতনঃ ইত্যনামিকাভ্যাং নমঃ৷ পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোহথ সহস্রশঃ ইতি কনিষ্ঠাভ্যাং নমঃ। নানাবিধানি দিব্যানি নানা বর্ণাকৃতীনি চ ইতি করতল পৃষ্ঠাভ্যাং নমঃ ইতি করন্যাসঃ৷


নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ইতি হৃদয়ায় নমঃ৷

ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ইতি শিরসে স্বাহা৷

অচ্ছেদ্যোহয়মদাহ্যোহয়মক্লেদ্যোহশোষ্য এব চ ইতি শিখায়ৈ বষট্।

নিত্যঃ সর্বগতঃ স্থাণুরচলোহয়ং সনাতনঃ ইতি কবচায় হুম্ ৷

পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোহথ সহস্রশঃ ইতি নেত্রত্রয়ায় বৌষট্।

নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণাকৃতীনি চেতি অস্ত্রায় ফট্৷ ইতি অঙ্গন্যাসঃ৷

শ্রীকৃষ্ণপ্রীত্যর্থং পাঠে বিনিয়োগঃ৷

 গীতার ধ্যান:-                    ওঁ  

পার্থায় প্রতিবোধিতাং ভগবতা নারায়ণেন স্বয়ম্

ব্যাসেন গ্রথিতাং পুরাণমুনিনা মধ্যে মহাভারতম্৷

অদ্বৈতামৃতবর্ষিণীং ভগবতীমষ্টাদশাধ্যায়িনীম্

অম্ব ত্বামনুসন্দধামি ভগবদ্ গীতে ভবদ্বেষিণীম্ ॥১॥


সরলার্থ:- হে জননি ভগবদ্ গীতে মহাভারতের মধ্যে প্রাচীন মুনি ব্যাসদেবকর্তৃক গ্রথিত, স্বয়ং ভগবান নারায়ণকর্তৃক পার্থকে উপলক্ষ্য করে সম্যক্ রূপে বিজ্ঞাপিত, পুনর্জন্মনাশকারিণী অদ্বৈত তত্ত্বরূপ-অমৃতবর্ষিণী অষ্টাদশ-অধ্যায়রূপিণী ভগবতী তোমাকে আমি মনে মনে চিন্তা করিতেছি ॥১॥

নমোহস্তু তে ব্যাস বিশালবুদ্ধে ফুল্লারবিন্দায়্তপত্রনেত্র৷

যেন ত্বয়া ভারততৈলপূর্ণঃ প্রজ্বালিতো জ্ঞানময়ঃ প্রদীপঃ ॥২॥


সরলার্থ:- হে বিকশিত পদ্মপত্রের ন্যায় চক্ষুবিশিষ্ট মহাবুদ্ধি ব্যাসদেব, তোমায় নমস্কার, তোমাকর্তৃক মহাভারতরূপ তৈলদ্বারা পরিপূর্ণ জ্ঞানময় প্রদীপ প্রজ্বালিত হয়েছে ॥২॥

প্রপন্ন পারিজাতায় তোত্রবেত্রৈকপাণয়ে৷

জ্ঞানমুদ্রায় কৃষ্ণায় গীতামৃতদুহে নমঃ ॥৩॥


সরলার্থ:- শরণাগতের পক্ষে পারিজাত (কল্পবৃক্ষ) তুল্য, অশ্বচালনার জন্য এক হস্তে চাবুক ও লাগামধারী, জ্ঞানমুদ্রাবিশিষ্ট-হস্ত [অর্জুনকে উপদেশ দিবার জন্য তর্জনী ও অঙ্গুষ্ঠাঙ্গুলি মিলিত করে যে মুদ্রা তা-ই জ্ঞানমুদ্রা ], গীতারূপ অমৃত দোহনকারী শ্রীকৃষ্ণকে নমস্কার ॥৩॥

সর্বোপনিষদো গাবো দোগ্ধা গোপালনন্দনঃ

পার্থো বৎসঃ সুধীর্ভোক্তা দুগ্ধং গীতামৃতং মহৎ ॥৪॥


সরলার্থ:- উপনিষদসকল গাভীস্বরূপ গোপালনন্দন শ্রীকৃষ্ণ দোহনকর্তা, অর্জুন বৎস (বাছুর) তুল্য, গীতার অমৃতরূপ বাণী উৎকৃষ্ট দুগ্ধসদৃশ, পণ্ডিতব্যক্তিগণ এ দুগ্ধ পানকর্তা ॥৪॥


বসুদেবসুতং দেবং কংসচাণূরমর্দনম্৷

দেবকীপরমানন্দং কৃষ্ণং বন্দে জগদ্ গুরুম্ ॥৫॥


সরলার্থ:- বসুদেবের পুত্র, কংস ও চাণূর দৈত্যের বিনাশকারী, দেবকীর পরম আনন্দপ্রদ, জগদ্ গুরু দীপ্তিমান্ শ্রীকৃষ্ণকে বন্দনা করি ॥৫॥


ভীষ্মদ্রোণতটা জয়দ্রথজলা গান্ধারনীলোপলা

শল্যগ্রাহবতী কৃপেণ বহনী কর্ণেন বেলাকুলা৷

অশ্বথামবিকর্ণঘোরমকরা দুর্যোধনাবর্তিনী

সৌত্তীর্ণা খলু পাণ্ডবৈ রণনদী কৈবর্তকে কেশবে॥৬॥


সরলার্থ:- ভীষ্ম ও দ্রোণ যে যুদ্ধরূপ নদের তট, জয়দ্রথ যার জল, গান্ধার (গান্ধার-রাজ-শকুনী) যাতে পিচ্ছিল নীলপ্রস্তর, শল্য যাতে কুমীর, কৃপাচার্য যাতে প্রবাহস্বরূপ, কর্ণ যার তীরপ্লাবী তরঙ্গ, অশ্বথামা ও বিকর্ণ যাতে ভীষণ মকরসদৃশ, দুর্যোধন যার আবর্ত সেই রণনদী কেশব কর্ণধার হওয়ায় পাণ্ডবেরা নিশ্চিতরূপে উত্তীর্ণ হয়েছে ॥৬॥

পারাশর্যবচঃসরোজমমলং গীতার্থগন্ধোৎকটং

নানাখ্যানককেশরং হরিকথাসম্বোধনাবধিতম্ ৷

লোকে সজ্জনষট্ পদৈরহরহঃ পেপীয়মানং মুদা

ভূয়াদ্ভারতপঙ্কজং কলিমলপ্রধ্বংসি নঃ শেয়সে ॥৭॥




সরলার্থ:- অমল কলিকলুষনাশক গীতার উপদেশরূপ সুগন্ধযুক্ত, নানা আখ্যানরূপ কেশরবিশিষ্ট, শ্রীকৃষ্ণের বাণীদ্বারা প্রবোধিত, জগতে সর্বদা সজ্জনরূপ ভ্রমরগণ কর্তৃক সানন্দে পুনঃপুনঃ পীয়্মান, পরাশরনন্দন বেদব্যাসের বাক্য-সরোবরে উৎপন্ন মহাভারতরূপ পদ্ম আমাদের কল্যাণের নিমিত্ত হোক ॥৭॥

মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্৷

যৎকৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দমাধবম্ ॥৮॥



সরলার্থ:- যাঁর কৃপা বোবাকে বাচাল করে, পঙ্গুকে পর্বত অতিক্রম করায়, সেই পরমানন্দ মাধবকে আমি বন্দনা করি ॥৮॥

যং ব্রহ্মাবরুণেন্দ্ররুদ্রমরুতঃ স্তুন্বন্তি দিব্যৈইঃ স্তবৈ- র্বেদ্যৈইঃ সাঙ্গপদক্রমোপনিষদৈর্গায়ন্তি যং সামগাঃ ধ্যানাবস্থিত-তদ্ গতেন মনসা পশ্যন্তি যং যোগিনো যস্যান্তং ন বিদুঃ সুরগণা দেবায় তস্মৈ নমঃ ॥৯॥


যং ব্রহ্মা-বরুণ-ইন্দ্র-রুদ্র-মরুতঃ, স্তুন্বন্তি, দিব্যৈইঃ, স্তবৈঃ,

বেদ্যৈঃ, স-অঙ্গ-পদক্রম-উপনিষদৈঃ, গায়ন্তি, যম্, সাম-গাঃ,

ধ্যান-অবস্থিত-তদ্ গতেন, মনসা, পশ্যন্তি, যম্, যোগিনঃ,

যস্য, অন্তম্, ন, বিদুঃ, সুর-অসুরগণাঃ, দেবায়, তস্মৈ, নমঃ ॥৯॥


সরলার্থ:- ব্রহ্মা, বরুণ, ইন্দ্র, রুদ্র, ও মরুৎগণ দিব্য স্তবদ্বারা যাঁকে স্তুতি করেন, সামবেদগায়কগণ অঙ্গ, পদক্রম ও উপনিষদসহ সমগ্র বেদদ্বারা যাঁর স্তুতিগান করেন, যোগিগণ ধ্যানাবস্থিত তদ্ গতচিত্তে যাঁকে দর্শন করেন, দেবতা ও অসুরগণ যাঁর শেষ জানেন না, সেই দেবতাকে নমস্কার ॥৯॥

বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৪

কর্মসন্ন্যাস-যোগ

 


অর্জুন উবাচ

সন্ন্যাসং কর্মণাং কৃষ্ণ পুনর্যোগং চ সংসসি। 
যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ব্রুহি সুনিশ্চিতম্।।১।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে শ্রীকৃষ্ণ! প্রথমে তুমি আমাকে কর্ম ত্যাগ করতে বললে এবং তারপর কর্মযোগের অনুষ্ঠান করতে বললে। এই দুটির মধ্যে কোনটি অধিক কল্যাণকর, তা সুনিশ্চিতভাবে আমাকে বল। 

সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ। 
তয়োস্ত কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে।।২।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- কর্মত্যাগ কর্মযোগ উভয়ই মুক্তিদায়ক। কিন্তু, এই দুটির মধ্যে কর্মযোগ কর্ম সন্ন্যাস থেকে শ্রেয়। 

জ্ঞেয়ঃ স নিত্যসন্ন্যাসী যো ন দ্বেষ্টি ন কাঙ্ক্ষতি। 
নির্দ্বন্দ্বো হি মহাবাহো সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে।।৩।।
অনুবাদঃ হে মহাবাহো! যিনি তাঁর কর্মফলের প্রতি দ্বেষ বা আকাঙ্ক্ষা করেন না, তাঁকেই নিত্য সন্নাসী বলে জানবে। এই প্রকার ব্যক্তি দ্বন্দ্বরহিত এবং পরম সুখে কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন।


সাংখ্যযোগৌ পৃথগ্ বালাঃ প্রবদন্তি ন পন্ডিতাঃ। 
একমপ্যাস্থিতঃ সম্যগুভয়োর্বিন্দতে ফলম্।।৪।।
অনুবাদঃ অল্পজ্ঞ ব্যক্তিরাই কেবল সাংখ্যযোগ ও কর্মযোগকে পৃথক পৃথক পদ্ধতি বলে প্রকাশ করে, পন্ডিতেরা তা বলেন না। উভয়ের মধ্যে যে কোন একটিকে সুষ্ঠুরূপে আচরণ করলে উভয়ের ফলই লাভ হয়। 

যৎ সাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদ্ যোগৈরপি গম্যতে। 
একং সাংখ্যংক চ যোগং চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।৫।।
অনুবাদঃ যিনি জানেন, সাংখ্য-যোগের দ্বারা যে গতি লাভ হয়, কর্মযোগের দ্বারাও সেই গতি প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং যিনি সাংখ্যযোগ ও কর্ম-যোগকে এক বলে জানেন, তিনিই যথার্থ তত্ত্বদ্রষ্টা। 

সন্ন্যাসস্ত মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ। 
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি।।৬।।
অনুবাদঃ হে মহাবাহো! কর্মযোগ ব্যতীত কেবল কর্মত্যাগরূপ সন্ন্যাস দুঃখজনক। কিন্তু যোগযুক্ত মুনি অচিরেই ব্রহ্মকে লাভ করেন। 

যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ। 
সর্বভুতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে।।৭।।
অনুবাদঃ যোগযুক্ত জ্ঞানী বিশুদ্ধ বুদ্ধি, বিশুদ্ধ চিত্ত ‍ও জিতেন্দ্রিয় এবং তিনি সমস্ত জীবের অনুরাগভাজন হয়ে সমস্ত কর্ম করেও তাতে লিপ্ত হন না। 

নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ। 
পশ্যন্ শৃণ্বন্ স্পৃশন্ জিঘ্রন্নশ্নন্ গচ্ছন্ স্বপন্ শ্বসন্।।৮।।
প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্নন্নুন্মিষন্নিমিষন্নপি।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন্।।৯।।
অনুবাদঃ চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ, ভোজন, গমন, নিদ্রা ও নিঃশ্বাস আদি ক্রিয়া করেও সর্বদা জানেন যে, প্রকৃতপক্ষে তিনি কিছুই করছেন না। কারণ প্রলাপ, ত্যাগ, গ্রহণ, চক্ষুর উন্মেষ ও নিমেষ করার সময় তিনি সব সময় জানেন যে, জড় ইন্দ্রিয়গুলিই কেবল ইন্দ্রিয়ের বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়েছে, তিনি নিজে কিছুেই করছেন না। 

ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ। 
লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা।।১০।।
অনুবাদঃ যিনি সমস্ত কর্মের ফল পরমেশ্বর ভগবানকে অর্পণ করে অনাসক্ত হয়ে কর্ম করেন, কোন পাপ তাঁকে কখনও স্পর্শ করতে পারে না, ঠিক যেমন জল পদ্মপাতাকে স্পর্শ করতে পারে না। 



কায়েন মনসা বুদ্ধ্যা কেবলৈরিন্দ্রিয়ৈরপি।
যোগিনঃ কর্ম কুর্বন্তি সঙ্গং ত্যক্ত্বাত্মশুদ্ধয়ে।।১১।।
অনুবাদঃ আত্মশুদ্ধির জন্য যোগীরা কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করে দেহ, মন, বুদ্ধি, এমন কি ইন্দ্রিয়ের দ্বারাও কর্ম করেন। 
যুক্তঃ কর্মফলং ত্যক্ত্বা শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্।
অযুক্তঃ কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে।।১২।।
অনুবাদঃ যোগী কর্মফল ত্যাগ করে নৈষ্ঠিকী শান্তি লাভ করেন; কিন্তু সকাম কর্মী কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ে কর্ম করার ফলে কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। 
 
সর্বকর্মাণি মনসা সংন্যস্যাস্তে সুখং বশী। 
নবদ্বারে পুরে দেহী নৈব কুর্বন্ন কারয়ন্।।১৩।।
 অনুবাদঃ বাহ্যে সমস্ত কার্য করেও মনের দ্বারা সমস্ত কর্ম ত্যাগ করে জীব নবদ্বার-বিশিষ্ট দেহরুপ গৃহে পরম সুখে বাস করতে থাকেন; তিনি নিজে কিছুই করেন না এবং কাউকে দিয়েও কিছু করান না। 

ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ। 
ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে।।১৪।।
অনুবাদঃ দেহরূপ নগরীর প্রভু জীব কর্ম সৃষ্টি করে না, সে কাউকে দিয়ে কিছু করায় না এবং সে কর্মের ফলও সৃষ্টি করে না। এই সবই হয় জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাবে। 
 

 
নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ। 
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ।।১৫।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান জীবের পাপ অথবা পুণ্য কিছুই গ্রহণ করেন না। অজ্ঞানের দ্বারা প্রকৃত জ্ঞান আবৃত হওয়ার ফলে জীবসমূহ মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। 

জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিতমাত্মনঃ। 
তেষামাদিত্যবজজ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎ পরম্।।১৬।।
অনুবাদঃ জ্ঞানের প্রভাবে যাঁদের অজ্ঞান বিনষ্ট হয়েছে, তাঁদের সেই জ্ঞান অপ্রাকৃত পরমতত্ত্বকে প্রকাশ করে, ঠিত যেমন দিনমানে সূর্যের উদয়ে সব কিছু প্রকাশিত হয়। 
 
তদ্বুদ্ধয়স্তদাত্মানস্তন্নিষ্ঠাস্তৎপরায়ণাঃ। 
গচ্ছন্ত্যপুনরাবৃত্তিং জ্ঞাননির্ধূতকল্মষাঃ।।১৭।।
অনুবাদঃ যাঁর বুদ্ধি ভগবানের প্রতি উন্মুখ হয়েছে, মন ভগবানের চিন্তায় একাগ্র হয়েছে, নিষ্ঠা ভগবানের দৃঢ় হয়েছে এবং যিনি ভগবানকে তাঁর একমাত্র আশ্রয় বলে গ্রহণ করেছেন, জ্ঞানের দ্বারা তাঁর সমস্ত কলুষ সম্পূর্ণরূপে বিধৌত হয়েছে এবং তিনি জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছেন। 
 
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পন্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ।।১৮।।
অনুবাদঃ জ্ঞানবান পন্ডিতেরা বিদ্যা-বিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গাভী, হস্তী, কুকুর ও চন্ডাল সকলের প্রতি সমদর্শী হন। 
ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্তিতং মনঃ।
নির্দোষং হি সমং ব্রজ তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ।।১৯।।
অনুবাদঃ যাঁদের মন সাম্যে অবস্থিত হয়েছে, তাঁরা ইহলোকেই জন্ম ও মৃত্যুর সংসার জয় করেছেন। তাঁরা ব্রহ্মের মতো নির্দোষ, তাই তাঁরা ব্রহ্মেই অবস্থিত হয়ে আছেন। 
 
ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্।
স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স্থিতঃ।।২০।।
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি প্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে উৎফুল্ল হন না এবং অপ্রিয় বস্তুর প্রাপ্তিতে বিচলিত হন না, যিনি স্থিরবুদ্ধি, মোহশূন্য ও ভগবৎ-তত্ত্ববেত্ত, তিনি ব্রহ্মেই অবস্থিত।
 
বাহ্যস্পর্শেষ্বসক্তাত্মা বিন্দত্যাত্মনি যৎ সুখম্। 
স ব্রহ্মযোগযুক্তাত্মা সুখমক্ষয়মশ্নুতে।।২১।।
অনুবাদঃ সেই প্রকার ব্রহ্মবিৎ পুরুষ কোন রকম জড় ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হন না, তিনি চিদগত সুখ লাভ করেন। ব্রহ্মে যোগযুক্ত হয়ে তিনি অক্ষয় সুখ ভোগ করেন। 
 
যে হি সংস্পর্শজা ভোগা দুঃখযোনয় এব তে।
আদ্যন্তবন্তঃ কৌন্তেয় ন তেষু রমতে বুধঃ।। ২২।।
অনুবাদঃ বিবেকবান পুরুষ দুঃখের কারণ যে ইন্দ্রিয়জাত বিষয়ভোগ তাতে আসক্ত হন না। হে কৌন্তেয়! এই ধরনের সুখভোগ আদি ও অন্তবিশিষ্ট। তাই, জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাতে প্রীতি লাভ করেন না। 
 
শক্নোতীহৈব যঃ সোঢ়ুং প্রাক্ শরীরবিমোক্ষণাৎ।
কামক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্তঃ স সুখী নরঃ।।২৩।।
 অনুবাদঃ এই দেহ ত্যাগ করার পূর্বে যিনি কাম, ক্রোধ থেকে উদ্ভুত বেগ সহ্য করতে সক্ষম হন, তিনিই যোগী এবং এই জগতে তিনিই সুখী হন।

 যোহন্তঃসুখোহন্তরারামস্তথান্তর্জ্যোতিরেব যঃ।
স যোগী ব্রহ্মনির্বাণং ব্রহ্মভূতোহধিগচ্ছতি।।২৪।।
অনুবাদঃ যিনি আত্মাতেই সুখ অনুভব করেন, যিনি আত্মাতেই ক্রীড়াযুক্ত এবং আত্মাই যাঁর লক্ষ্য, তিনিই যোগী। তিনি ব্রহ্মে অবস্থিত হয়ে ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন।

লভন্তে ব্রহ্মনির্বাণম্ ঋষয়ঃ ক্ষীণকল্মষাঃ।
ছিন্নদ্বৈধা যতাত্মানঃ সর্বভূতহিতে রতাঃ।।২৫।।
অনুবাদঃ সংযতচিত্ত, সমস্ত জীবের কল্যাণে রত এবং সংশয় রহিত নিষ্পাপ ঋষিগণ ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন।

কামক্রোধবিমুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্।
অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্।।২৬।।
অনুবাদঃ কাম-ক্রোধশূন্য, সংযতচিত্ত, আত্মতত্ত্বজ্ঞ সন্ন্যাসীরা সর্বতোভাবে অচিরেই ব্রহ্মনির্বাণ লাভ করেন।

স্পর্শান্ কৃত্বা বহির্বাহ্যাংশ্চক্ষুশ্চৈবান্তরে ভ্রুবোঃ।
প্রাণাপানৌ সমৌ কৃত্বা নাসাভ্যন্তরচারিণৌ।।২৭।।
যতেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধির্মুনির্মোক্ষপরায়ণঃ।
বিগতেচ্ছাভয়ক্রোধো যঃ সদা মুক্ত এব সঃ।।২৮।।
অনুবাদঃ মন থেকে বাহ্য ইন্দ্রিয়ের বিষয় প্রত্যাহার করে, ভ্রুযুগলের মধ্যে দৃষ্টি স্থির করে, নাসিকার মধ্যে বিচরণশীল প্রাণ ‍ও অপান বায়ুর উর্ধ্ব ও অধোগতি রোধ করে, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সংযম করে এবং ইচ্ছা, ভয় ও ক্রোধ শূন্য হয়ে যে মুনি সর্বদা বিরাজ করেন, তিনি নিশ্চিতভাবে মুক্ত।

ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।।২৯।।
অনুবাদঃ আমাকে সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সমস্ত জীবের সুহৃদরূপে জেনে যোগীরা জড় জগতের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করেন।

জ্ঞানযোগ

 




শ্রীভগবানুবাচ
ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্।।
বিবস্বান্মবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীৎ।।১।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন-আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ বলেচিলাম। সূর্য তা মানবজাতির জনক মনুকে বলেছিলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন।

এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ।
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ।।২।।
অনুবাদঃ এভাবেই পরম্পরা মাধ্যমে প্রাপ্ত এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিলেন। কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং তাই সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।

স এবায়ং ময়া তেহদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ।
ভক্তোহসি মে সখা চেতি রহস্যং হ্যেতদুত্তমম্।।৩।।
অনুবাদঃ সেই সনাতন যোগ আজ আমি তোমাকে বললাম, কারণ তুমি আমার ভক্ত ও সখা এবং তাই তুমি এই বিজ্ঞানের অতি গূঢ় রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে।

অর্জুন উবাচ
অপরং ভবতো জন্ম পরং জন্ম বিবস্বতঃ।
কথমেতদ্ বিজ্ঞানীয়াং ত্বমাদৌ প্রোক্তবানিতি।।৪।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন-সূর্যদেব বিবস্বামানের জন্ম জয়েছিল তোমার অনেক পূর্বে। তুমি যে পুরাকালে তাঁকে এই জ্ঞান উপদেশ করেছিলে, তা আমি কেমন করে বুঝব?

শ্রীভগবানুবাচ
বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।।৫।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পরন্তপ অর্জুন! আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে। আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি, কিন্তু তুমি পার না।


অজেহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানীমীম্বরোহপি সন্।
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।৬।।
অনুবাদঃ যদিও আমি জন্মরহিত এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।


যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজামহ্যম্।।৭।।
অনুবাদঃ হে ভারত! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই।

পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।৮।।
অনুবাদঃ সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।৯।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! ‍যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।

বীতরাগভয়ক্রোধা মন্ময়া মামুপাশ্রিতাঃ।
বহুবো জ্ঞানতপসা পূতা মদ্ভাবমাগতাঃ।।১০।।
অনুবাদঃ আসক্তি, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত হয়ে, সম্পূর্ণরূপে আমাতে মগ্ন হয়ে, একান্তভাবে আমার আশ্রিত হয়ে, পূর্বে বহু বহু ব্যক্তি আমার জ্ঞান লাভ করে পবিত্র হয়েছে-এবং এভাবেই সকলেই আমার অপ্রাকৃত প্রীতি লাভ করেছে।


 যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।১১।।
অনুবাদঃ যারা যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, আমি তাদেরকে সেভাবেই পুরস্কৃত করি। হে পার্থ! সকলেই সর্বতোভাবে আমার পথ অনুসরণ করে।

কাঙ্ক্ষন্তঃ কর্মণাং সিদ্ধিং  যজন্ত ইহ দেবতাঃ।
ক্ষিপ্রং হি মানষে লোকে সিদ্ধির্ভবতি কর্মজা।।১২।।
অনুবাদঃ এই জগতে মানুষেরা সকাম কর্মের সিদ্ধি কামনা করে এবং তাই তারা বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করে। সকাম কর্মের ফল অবশ্যই অতি শীর্ঘ্রই লাভ হয়।

চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।১৩।।
অনুবাদঃ প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানব-সমাজে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি। আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।

ন মাং কর্মাণি লিম্পন্তি ন মে কর্মফলে স্পৃহা।
ইতি মাং যোহভিজানাতি কর্মভির্ন স বধ্যতে।।১৪।।
অনুবাদঃ কোন কর্মই আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং আমিও কোন কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা করি না। আমার এই তত্ত্ব যিনি জানেন, তিনিও কখনও সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হন না।

এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ।
কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্।।১৫।।
অনুবাদঃ প্রাচীনকালে সমস্ত মুক্ত পুরুষেরা আমার অপ্রাকৃত তত্ত্ব অবগত হয়ে কর্ম করেছেন। অতেএব তুমিও সেই প্রাচীন মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তোমার কর্তব্য সম্পাদন কর।

কিং কর্ম কিমকর্মেতি কবয়োহপ্যত্র মোহিতাঃ।
তত্তে কর্ম প্রবক্ষ্যামি যজজ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ।।১৬।।
অনুবাদঃ কাকে কর্ম ও কাকে অকর্ম বলে, তা স্থির করতে বিবেকী ব্যক্তিরাও মোহিত হন। আমি সেই কর্ম বিষয়ে তোমাকে উপদেশ করব। তুমি তা অবগত হয়ে সমস্ত অশুভ অবস্থা থেকে মুক্ত হবে।

কর্মণো হ্যপি বোদ্ধব্যং বোদ্ধব্যং চ বিকর্মণঃ।
অকর্মণশ্চ বোদ্ধব্যং গহনা কর্মণো গতিঃ।।১৭।।
অনুবাদঃ কর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন। তাই কর্ম, বিকর্ম ও অকর্ম সম্বন্ধে যথাযথভাবে জানা কর্তব্য।

কর্মণ্যকর্ম যঃ পশ্যেদকর্মণি চ কর্ম যঃ।
স বুদ্ধিমানন্মনুষ্যেষু স যুক্তঃ কৃৎস্নকর্মকৃৎ।।১৮।।
অনুবাদঃ যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনীই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান। সব রকম কর্মে লিপ্ত থাকা সেত্ত্বেও তিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত।

যস্য সর্বে সমারম্ভাঃ কামসংকল্পবর্জিতাঃ।
জ্ঞানাগ্নিদগ্ধকর্মাণং তমাহুঃ পন্ডিতং বুধাঃ।।১৯।।
অনুবাদঃ যাঁরা সমস্ত কর্ম প্রচেষ্টা কাম ও সংকল্প রহিত, তিনি পূর্ণ জ্ঞানে অধিষ্ঠিত। জ্ঞানীগণ বলেন যে, তাঁর সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়া পরিশুদ্ধ জ্ঞানাগ্নি দ্বারা দগ্ধ হয়েছে।

ত্যক্তা কর্মফলাসঙ্গং নিত্যতৃপ্তো নিরাশ্রয়ঃ।
কর্মণ্যভিপ্রবৃত্তোহপি নৈব কিঞ্চিৎ করোতি সঃ।।২০।।
অনুবাদঃ যিনি কর্মফলের আসক্তি সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং কোন রকম আশ্রয়ের অপেক্ষা করেন না, তিনি সব রকম কর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও কর্মফলের আশায় কোন কিছুই করেন না।

নিরাশীর্যতচিত্তাত্মা ত্যক্তসর্বপরিগ্রহঃ।
শারীরং কেবলং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্।।২১।।
অনুবাদঃ এই প্রকার জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁর মন ও বুদ্ধিকে সর্বতোভাবে সংযত করে কার্য করেন। তিনি প্রভুত্ব করার প্রবৃত্তিপরিত্যাগ করে কেবল জীবন ধারণের জন্য কর্ম করেন। এভাবেই কর্ম করার ফলে কোন রকম পাপ তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।


যদৃচ্ছালাভসন্তুষ্টো দন্দ্বাতীতো বিমঃসরঃ।
সমঃ সিদ্ধাবসিদ্ধৌ চ কৃত্বাপি ন নিবধ্যতে।।২২।।
অনুবাদঃ যিনি অনায়াসে যা লাভ করেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, যিনি সুখ-দুঃখ, রাগ-দ্বেষ আদি দ্বন্দ্বের বশীভুত হন না এবং মাৎসর্যশূন্য যিনি কার্যের সাফল্য ও অসাফল্যে অবিচলিত থাকেন, তিনি কর্ম সম্পাদন করলেও কর্মফলের দ্বারা কখনও আবদ্ধ হন না।

 গতসঙ্গস্য মুক্তস্য জ্ঞানাবস্থিতচেতসঃ।
যজ্ঞায়াচরতঃ কর্ম সমগ্রং প্রবিলীয়তে।।২৩।।
অনুবাদঃ জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে, চিন্ময় জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি যজ্ঞের উদ্দেশ্যে যে কর্ম সম্পাদন করেন, সেই সকল কর্ম সম্পূর্ণরূপে লয় প্রাপ্ত হয়।

 
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিব্র্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।।২৪।।
অনুবাদঃ যিনি কৃষ্ণভাবনায় সম্পূর্ণ মগ্ন তিনি অবশ্যই চিৎজগতে উন্নীত হবেন, কারণ তাঁর সমস্ত কার্যকলাপ চিন্ময়। তাঁর কর্মের উদ্দেশ্য চিন্ময় এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি যা নিবেদন করেন, তাও চিন্ময়।

দৈবমেবাপরে যজ্ঞং যোগিনঃ পর্যুপাসতে।
ব্রহ্মাগ্নাবপরে যজ্ঞং যজ্ঞেনৈবোপজুহ্বতি।।২৫।।
অনুবাদঃ কোনও কোনও যোগী দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার মাধ্যমে তাঁদের উপাসনা করেন, আর অন্য অনেকে ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে সব কিছু নিবেদন করার মাধ্যমে যজ্ঞ করেন।

শ্রোত্রাদীনীন্দ্রিয়াণ্যন্যে সংযমাগ্নিষু জুহুতি।
শব্দাদীন্ বিষয়ানন্য ইন্দ্রিয়াগ্নিষু জুহুতি।।২৬।।
অনুবাদঃ কেউ কেউ (শুদ্ধ ব্রহ্মচারীরা) মনঃসংযমরূপ অগ্নিতে শ্রবণ আদি ইন্দ্রিয়গুলিকে আহুতি দেন, আবার অন্য অনেকে (নিয়মনিষ্ঠ গৃহস্তেরা) শব্দাদি ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলিকে ইন্দ্রিয়রূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।

সর্বাণীন্দ্রিয়কর্মাণি প্রাণকর্মাণি চাপরে।
আত্মসংযমযোগাগ্নৌ জুহুতি জ্ঞানদীপিতে।।২৭।।
অনুবাদঃ মন ও ইন্দ্রিয়-সংযমের মাধ্যমে যাঁরা আত্মজ্ঞান লাভের প্রয়াসী, তাঁরা তাঁদের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ ও প্রাণবায়ু জ্ঞানের দ্বারা প্রদীপ্ত আত্মসংযমরূপ অগ্নিতে আহুতি দেন।

দ্রব্যযজ্ঞাস্তপোযজ্ঞা যোগযজ্ঞাস্তথাপরে।
স্বাধ্যায়জ্ঞানযজ্ঞাশ্চ যতয়ঃ সংশিতব্রতাঃ।।২৮।।
অনুবাদঃ কঠোর ব্রত গ্রহণ করে কেউ কেউ দ্রব্য দানরূপ যজ্ঞ করেন। কেউ কেউ তপস্যারূপ যজ্ঞ করেন, কেউ কেউ অষ্টাঙ্গ-যোগরূপ যজ্ঞ করেন এবং অন্য অনেকে পারমার্থিক জ্ঞান লাভের জন্য বেদ অধ্যয়নরূপ যজ্ঞ করেন।

অপানে জুহুদি প্রাণং প্রাণেহপানং তথাপরে।
প্রাণাপানগতী রুদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ।
অপরে নিয়তাহারাঃ প্রাণান্ প্রাণেষু জুহুতি।।২৯।।
অনুবাদঃ আর যাঁরা প্রাণায়াম চর্চায় আগ্রহী, তাঁরা অপান বায়ুকে প্রাণবায়ুতে এবং প্রাণবায়ুকে অপান বায়ুতে আহুতি দিয়ে অবশেষে প্রাণ ও অপান বায়ুর গতি রোধ করে সমাধিস্থ হন। কেউ আবার আহার সংযম করে প্রাণবায়ুকে প্রাণবায়ুতেই আহুতি দেন।

সর্বেহপ্যেতে যজ্ঞবিদো যজ্ঞক্ষপিতকল্মষাঃ। 
যজ্ঞশিষ্টামৃতভুজো যান্তি ব্রহ্ম সনাতনম্।।৩০।।
অনুবাদঃ এঁরা সকলেই যজ্ঞতত্ত্ববিৎ এবং যজ্ঞের প্রভাবে পাপ থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা যজ্ঞাবশিষ্ট অমৃত আস্বাদন করেন, এবং তার পর সনাতন প্রকৃতিতে ফিরে যান।

নায়ং লোকোহস্ত্যযজ্ঞস্য কুতোহন্যঃ কুরুসত্তম।।৩১।।
অনুবাদঃ হে কুরুশ্রেষ্ঠ! যজ্ঞ অনুষ্ঠান না করে কেউই এই জগতে সুখে থাকতে পারে না, তা হলে পরলোকে সুখপ্রাপ্তি কি করে সম্ভব?

এবং বহুবিধা যজ্ঞা বিবতা ব্রহ্মণো মুখে। 
কর্মজান্ বিদ্ধি তান্ সর্বানেবং জ্ঞাত্বা বিমোক্ষ্যসে।।৩২।।
অনুবাদঃ এই সমস্ত যজ্ঞই বৈদিক শাস্ত্রে অনুমোদিত হয়েছে এবং এই সমস্ত মুক্তি বিভিন্ন প্রকার কর্মজাত। সেগুলিকে যথাযথভাবে জানার মাধ্যমে তুমি মুক্তি লাভ করতে পারবে।

শ্রেয়ান্ দ্রব্যময়াদ্ যজ্ঞাজজ্ঞানযজ্ঞঃ পরন্তপ। 
সর্বং কর্মাখিলং পার্থ জ্ঞানে পরিসমাপ্যতে।।৩৩।।
অনুবাদঃ হে পরন্তপ! দ্রব্যময় যজ্ঞ থেকে জ্ঞানময় যজ্ঞ শ্রেয়। হে পার্থ! সমস্ত কর্মই পূর্ণরূপে চিন্ময় জ্ঞানে পরিসমাপ্তি লাভ করে।

তদ্ বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। 
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ।।৩৪।।
অনুবাদঃ সদগুরুর শরণাগত হয়ে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা কর। বিনম্র চিত্তে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কর এবং অকৃত্রিম সেবার দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট কর। তা হলে সেই তত্ত্বদ্রষ্টা পুরুষেরা তোমাকে জ্ঞান উপদেশ দান করবেন।

যজজ্ঞাত্বা ন পুনর্মোহমেবং যাস্যসি পান্ডব। 
যেন ভূতান্যশেষাণি দ্রক্ষ্যস্যাত্মন্যথো ময়ি।।৩৫।।
অনুবাদঃ হে পান্ডব! এভাবে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে না, কেন না এই জ্ঞানের দ্বারা তুমি দর্শন করবে যে, সমস্ত জীবই আমার বিভিন্ন অংশ অর্থাৎ তারা সকলেই আমার এবং তারা আমাতে অবস্থিত।

অপি চেদসি পাপেভ্যঃ সর্বেভ্যঃ পাপকৃত্তমঃ।
সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি।।৩৬।।
অনুবাদঃ তুমি যদি সমস্ত পাপীদের থেকেও পাপিষ্ঠ বলে গণ্য হয়ে থাক, তা হলেও এই জ্ঞানরূপ তরণীতে আরোহণ করে তুমি দুঃখ-সমুদ্র পার হতে পারবে।

যথৈধাংসি সমিদ্বোহগ্নির্ভস্মাৎ কুরুতেহর্জুন। 
জ্ঞানাগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎ কুরুতে তথা।।৩৭।।
অনুবাদঃ প্রবলরূবে প্রজ্বলিত অগ্নি যেমন কাষ্ঠকে ভস্মসাৎ করে, হে অর্জুন! তেমনই জ্ঞানাগ্নিও সমস্ত কর্মকে দগ্ধ করে ফেলে।

ন হি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে। 
তৎ স্বয়ং যোগসংসিদ্ধঃ কালেনাত্মনি বিন্দতি।।৩৮।।
অনুবাদঃ এই জগতে চিন্ময় জ্ঞানের মতো পবিত্র আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সমস্ত যোগের পরিপক্ক ফল। ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের মাধ্যমে যিনি সেই জ্ঞান আয়ত্ত করেছেন, তিনি কালক্রমে আত্মায় পরা শান্তি লাভ করেন।

শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ। 
জ্ঞানং লব্ধা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি।।৩৯।।
অনুবাদঃ সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে চিন্ময় তত্ত্বজ্ঞানে প্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞান লাভ করেন। সেই দিব্য জ্ঞান লাভ করে তিনি অচিরেই পরা শান্তি প্রাপ্ত হন।

অজ্ঞশ্চাশ্রদ্দধানশ্চ সংশয়াত্মা বিনশ্যতি। 
নায়ং লোকোহন্তি ন পরো ন সুখং সংশয়াত্মনঃ।।৪০।।
অনুবাদঃ অজ্ঞ ও শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি কখনই ভগবদ্ভক্তি লাভ করতে পারে না। সন্দিগ্ধ চিত্ত ব্যক্তি ইহলোকে সুখভোগ করতে পারে না এবং পরলোকেও সুখভোগ করতে পারে না।

যোগসংন্যস্তকর্মাণং জ্ঞানসংছিন্নসংশয়ম্। 
আত্মবন্তবং ন কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয়।।৪১।।
অনুবাদঃ অতএব, হে ধনঞ্জয়! যিনি নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা কর্মত্যাগ করেন, জ্ঞানের দ্বারা সংশয় নাশ করেন এবং আত্মার চিন্ময় স্বরূপ অবগত হন, তাঁকে কোন কর্মই আবদ্ধ করতে পারে না।

তস্মাদজ্ঞানসম্ভতং হৃৎস্থং জ্ঞানাসিনাত্মনঃ। 
ছিত্ত্বৈনং সংশয়ং যোগমাতিষ্ঠোত্তিষ্ঠ ভারত।।৪২।। 
অনুবাদঃ অতএব, হে ভারত! তোমার হৃদয়ে যে অজ্ঞানপ্রসূত সংশয়ের উদয় হয়েছে, তা জ্ঞানরূপ খড়্গের দ্বারা ছিন্ন কর। যোগাশ্রয় করে যুদ্ধ করার জন্য উঠে দাঁড়াও।

আমাদের জীবনে গীতা

  গীতা জ্ঞান সম্পর্কে অনাদি কাল থেকে বহু ভাষ্য ও উপাখ্যান লেখা হয়ে চলেছে; আজ ওই কাজে অনেক সাধক, অধ্যাপক ও অভ্যাসই লেগে আছেন।  যতই লেখা হোক ন...