(ক) গীতা র লৌকিক জ্ঞান
লৌকিক আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অদ্ভুত সুন্দর সমন্বয়ে গীতা | আমরা এর সামাজিক আর আধ্যাত্মিক পক্ষ নিয়ে পৃথক ভাবে আলোচনা করবো | সবার আগে গীতা জ্ঞানের লৌকিক পক্ষের পাঁচটি আয়াম, যথা সমাজশাস্ত্রীয় জ্ঞান, আদর্শ পুরুষের বিবিধ রূপ, হিংসা-অহিংসা ভেদ, কর্ম যোগ আর যজ্ঞ চক্র নিয়ে আলোচনা কারবো |
(১) গীতা র সমাজ শাস্ত্রীয় জ্ঞান
এব্যাপারে আলোচনা করার আগে আমাদের কে সমাজ শাস্ত্রের কিছু প্রচলিত বিবাদ নিয়ে আলোচনা করা দরকার| এই বিবাদ হল ব্যক্তি স্বাধীনতা বনাম সামাজিক ন্যায় নিয়ে আর তার থেকে উত্পন্ন সামাজিক সংস্থা ও ন্যায় ব্যাবস্থা নিয়ে, প্রগতির বিবিধ ধারণা নিয়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক তন্ত্রের বিকাস নিয়ে, চিরাচারিত পরম্পরা ও পরিবর্তন নিয়ে এমন কি বৈচারিক মতভেদ নিয়ে | এটা মানতে হবে যে গীতা তে সমাজসাস্ত্রীয় বিচার বর্ণ ব্যবস্থার সাথে জড়িত | স্বয়ং কৃষ্ণই চতুরবর্ণ জাতি ব্যাবস্থার সমর্থন করে বলেছেন, "গুণ আর কর্মের ভিত্তি তে আমি চারটি বর্ণ, যথা ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য আর শূদ্র, বানিয়েছি |" অষ্টাদশ অধ্যায়ে সমস্ত জাতির বিবিধ কার্মেরও বিবরণ গীতা তে বলা হয়েছে | এই কারণে কিছু মানুষ গীতা কে জাতি ভেদের সমর্থক হবার জন্য দোষারোপ করেন |
গীতা তে সমসাময়িক কাল খন্ডে প্রচলিত বর্ণ ব্যবস্থার বিবরণ পাওয়া যায় | বর্ণ ব্যবস্থা উত্পত্তি তে গুণ ও কর্মের ভূমিকা কে চতুর্থ অধ্যায়ে উপস্থাপিত করা হয়েছে | এতে বর্ণ ব্যবস্থার সমর্থক হবার মতো কোনো ব্যাপার গীতা তে নেই | বর্ণ ব্যবস্থার সহিত বর্তমানে প্রচলিত জাতির ও কোনো সঠিক সামঞ্জস্য নেই ; কারণ বর্ণ ব্যাবসা কর্মের আধারে হতো, জন্মের আধারে নয় |
গীতা কেবল এটাই বলতে চায় যে ব্যাবস্থা যেমনই হোক না কেন যে ব্যক্তি যেমন দায়িত্ব পেয়েছেন তা যথাযোগ্য পালন করে চলতে হবে; দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন কেই স্বধর্ম বলা হয়েছে | আধুনিক সমাজে মানুষের কর্তব্য বোধের অভাবের জন্য গীতা র শিক্ষা কে প্রাসঙ্গিক মনে করা যেতে পারে | কর্তব্য নিষ্ঠা ছেড়ে যেন কেন প্রকারে ধন উপার্জনে রত মানুষের জীবনে আজ হতাশা, নিরাশা, বৈষম্য আদি পরিলক্ষিত হচ্ছে | বর্ণ ব্যবস্থার সাথে সাথে যে প্রান্তে বর্গ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে সেখানে মানুষের জীবনে বিশেষ পরিবর্তন আসেনি | বিষয় শোষক -শোষিত, ধনবান- দরিদ্র আর অন্য যেকোনো বর্গ ব্যাবস্থারই হোক না কেনো বিশেষ পরিবর্তন মানুষের জীবনে আসেনি | এমন কি যেখানে বর্গ ব্যাবস্থা আর বর্ণ ব্যাবস্থা কে নিয়ে বিদ্রোহ হয়েছে সেখানে এক বল শালী সত্তা পক্ষ নতুন বর্গ হিসেবে উঠে এসেছে | ব্যবস্থা যেমনই হোক না কেনো নিয়ত কর্মের গুরুত্ব থাকবেই | এখানেই গীতা বর্ণিত স্বধর্ম-স্বকর্মের মহত্ব উদ্ভাসিত হয় |
যাই হোক না কেন গীতা র সমাজশাস্ত্রীয় জ্ঞান বাবস্থার ব্যাপ্তি অনেক বেশি; বর্ণ ব্যাবস্থা আর সেই মতো কর্ম মীমাংসা তার এক ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র | গীতা র চোদ্দো, ষোলো আর সতেরো অধ্যায় সমাজশাস্ত্রীয় জ্ঞানে পূর্ণ | এটাও উল্লেখ্য যে গীততেই প্রথম ত্রিগুন বিভেদ ও তার মহিমা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ; সত্ব থেকে প্রকাশ, রজ থেকে প্রবৃত্তি আর তম থেকে মোহ উত্পন্ন হয় | অষ্টাদশ অধ্যায়ে এমন ই বলা হয়েছে যে , "এই বিশ্ব সংসারে এমন কেও নেই যে এই তিন গুণ থেকে মুক্ত | (XVIII: 40 )
ষোলো অধ্যায়ে দৈব আর আসুরীক বৃত্তি অনুসারে সমাজ কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে | তাই এই অধ্যায়ে দৈবি বৃত্তির বিকাস আর আসুরীক বৃত্তির ত্যাগ বিষয়ে পথ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে | আত্ম সংযম আর আত্ম জ্ঞানের মাধ্যমেই তা সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে, তাই তাদের ভূমিকাও এই মর্মে নিশ্চই থাকবে |
সতেরো অধ্যায় অনুসারে আহার, যজ্ঞ , জপ ও দান এর নিরিখে সাত্বিক , রাজসিক আর তামসিক বর্গীকরণ হয়েছে | অষ্টাদশ অধ্যায়ে কর্ম, বুদ্ধি, সুখ এই - ত্রিগুণ কে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে | গীতা এও স্পষ্ট করে যে যজ্ঞ , দান তপ আদিও পরমার্থের জন্য করা উচিত | এই সকল কর্মে তামসিক ও রাজসিক গুণ পরিত্যাগ করে কেবল সাত্বিক গুণ গ্রহণ করা উচিত | স্বচেষ্টায় ও নিষ্ঠা সহকারে সাত্বিক গুণ ও দৈবি বৃত্তি পরিবর্ধিত কারার উপর গীতা বল দেয় |
গীতা র ঘোষণা দেখবার মতো, "নিজ প্রকৃতি অনুসারে মানুষের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের স্বরূপ নির্ধারিত হয় ও সেই অনুসারেই তার শ্রদ্ধা অনুরূপ বৃত্তি উত্পন্ন হবে | অর্থাত্ যার যেমন শ্রদ্ধা সে তেমন ই হবার জন্য প্রয়াত্নশীল হবে | " (অধ্যায় XVII: শ্লোক ৩ )
(২) গীতার আদর্শ পুরুষ
স্থিতপ্রজ্ঞের রূপান্তর গীতায় বর্ণিত দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষ আঠারো টি শ্লোকের মধ্যে দিয়ে করা হয়েছে | সমত্ব প্রাপ্তির পরে স্থির হয়ে যাওয়া প্রজ্ঞা কেই স্থিতপ্রজ্ঞা বলা হয় | সেই প্রজ্ঞার ধারক কে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হবে | স্থিতপ্রজ্ঞ জন হল নিস্প্রিহ, পরমাত্মা-পরায়ন, আত্ম-নিষ্ট, তৃষ্ণা, ভয় ও ক্রোধ মুক্ত, ইন্দ্রিয় জয়ী সুখ-দুঃখ, শুভাশুভে অবিচলিত সেই আত্মা |
কৃষ্ণ আগে বলছেন যে আত্মা মানুষ কে বিপথে চালনা করার জন্য যথেষ্ট সামর্থ্য রাখে | কেবল যপ, তপ আর অনাহার দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রনে আনা যায় না | তা বুদ্ধিমান পুরুষের মনের উপরও অধিকার কায়েম করে | এই অধোগতি বিষয় চিন্তা থেকে শুরু হয়ে আসক্তি, কাম , ক্রোধ, মোহ, স্মৃতি বিভ্রম আর বুদ্ধি নাশের মাধ্যামে মহা পতনে গিয়ে শেষ হয় | এর সমাধান সূত্রে বলা হয়েছে যে ইন্দ্রিয় কে রাগ -দ্বেষ আদি থেকে মুক্ত করে সাতত্য কর্মের মাধ্যামে আনন্দ ও বৌদ্ধিক স্থিরতা পাওয়া যায় | এর থেকেই সমত্ব আসে | সমত্ব ই বিবেক, ভক্তি ও শান্তির মূলধার | পরমাত্মা পরায়ণ না হয়ে সমত্ব ও পাওয়া যায় না | অর্থাত্ বলা যায় যে অকাম, নিস্প্রিহ, নিরহংকার পারামাত্মা পরায়ণ হয়েই শান্তি ও আনন্দ পাওয়া যায় | গীতা এই অভ্যাস কে দুটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে | ঠিক কচ্ছপ যেমন বিপদ সঙ্কূল পরিস্থিতি তে নিজ অঙ্গ সমূহ গুটিয়ে নেয় তেমনি বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয় সমূহ কে বিষয় চিন্তাও ভোগ বৃত্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্তর্মুখী হতে পারেন | আবার বলা হয়েছে যেমন নদীর জল পেয়েও সাগর অবিচলিত থাকে তেমনি ভোগ , সুখ আদি স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের কাছে এসে ক্ষান্ত হয়; ওই পুরুষ অবিচলিত থাকে | এই রূপ ব্যক্তি সতত ব্রহ্মে নিবাস করে দেহাবসানের পরে ব্রাহ্ম নির্বাণ পায় | এটাই স্পষ্ট যে গীতোপদেশ কে আত্মসাত করতে পারলেই স্থিতপ্রজ্ঞা ও মুক্তি |
এই প্রসঙ্গে কর্ম যোগ আর কর্ম সন্যাসের মাধ্যামে স্থিতপ্রজ্ঞ এর মতই জীবন মুক্তির পথে এক আদর্শ পুরুষ কে পঞ্চম অধ্যায়ে চিত্রায়িত করা হয়েছে | এমন পুরুষ যিনি মনোযোগী, ইন্দ্রিয় নিশপৃহ , মনোযোগী হয়ে জীবন যাপন করেন তিনিই জীবন মুক্ত | তিনি এটাও বুঝে নেন যে যা কিছু হয় সব প্রকৃতির গুণে, পরমাত্মার এতে কর্তা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা নেই | তাই এমন পুরুষ নিজ কৃত কর্মের দায়িত্ব ঈশ্বরে ন্যস্ত করে ক্ষান্ত হয় না | সে আত্মজ্ঞান পেয়ে পরমাত্মায় লীন হয়ে মুক্তি পাওয়ার পথে অগ্রসর হয় | এই অবস্থায় অদ্ভুত সমদৃষ্টি পেয়ে সেই পুরুষ সমস্ত প্রাণীর প্রতি সমভাব রাখে ও ক্রমাগত শুভ-অশুভ, প্রিয়- অপ্রিয় আদি ভেদ থেকে নিজেকে উপরে উঠিয়ে নেয় | এটা স্পষ্ট যে সমদৃষ্টির চরমোত্কর্ষ পেয়ে সেই ব্যক্তি ঈশ্বর কে ভোক্তা, লোক-কল্যানকারী মহেশ্বর হিসেবে দেখে | সে ব্রহ্মবেত্তা, বুদ্ধ, জ্ঞানী , পন্ডিত ও যোগী |
গীতার তৃতীয় আদর্শ পুরুষের চিত্রণ দ্বাদশ অধ্যায়ে ভক্ত হিসেবে করা হয়েছে | এতে বলা হয়েছে অদ্বেষি, লোক হিতৈশি, দয়াবান, ক্ষমাশীল , নিরহংকার ইন্দ্রিয় - নিগ্রহি , সমত্ব যোগ যুক্ত ঈশ্বর পরায়ণ পুরুষ ই ভক্ত | সে নিন্দা- প্রশংসা, মান- অপমান, শুভ -অশুভ , সুখ-দুঃখ আদির প্রতি সমত্ব ভাব রেখে আনন্দ, রাগ, হিংসা, ক্রোধ আদি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে | সে কারো উপর বিরক্ত হয় না, অন্য কেউও তার উপর বিরক্ত হয় না | অনন্ত ভক্তির মাধ্যামে গুনাতীত হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথে চলার সময় রজো ও তমো গুণ কে পুরোপুরি ক্ষান্ত করে সাত্বিক ও ঈশ্বরে অনুরক্ত হয়ে উঠতে হবে | এইভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে ভক্ত, গুনাতীত , স্থিতপ্রজ্ঞ ও জীবন মুক্ত আসলে একই পুরুষের নির্দেশক |
একই পুরুষ কে নানা পরিস্থিতি তে ও পরিবর্তিত পটভূমিতে নানা ভূমিকায় অবতরিত হতে আর ক্রিয়াশীল হতে আমরা দেখি | ত্তদের সকলের মাঝে গুণ পরিবর্ধক ও গুণ নিয়ন্ত্রক সাত্তার বাস্তব প্রকৃতি একই সেই পারমেশ্বর ও শাশ্বত শক্তির অংশ সংযুক্তি |
(৩) যুদ্ধ, অহিংসা ও সত্যাগ্রহের সমস্যা
ভিন্ন মত পোষণকারী গুণী জনের একাংশের মতে অহিংসা ও শান্তির মন্ত্রে দীক্ষিত অর্জুন কে যুদ্ধের জন্য রাজী করানোই হলো গীতার প্রাথমিক উদ্দেশ্য | ভিন্ন এক মতে গীতা অহিংসা ও শান্তিরই বার্তা দেয় | এই দুই মতের উপর আমরা পৃথক ভাবে আলোচনা করবো |
যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়েই অর্জুন যুদ্ধের জন্য রাজী না হয়ে রথে বসে পড়েছিলেন | কৃষ্ণ নানা ভাবে অর্জুন কে যুদ্ধ কারার জন্য রাজী করাতে লাগলেন, তাকে কর্তব্য পরায়ণ হয়ে যুদ্ধ করবার জন্য বলতে লাগলেন ; তিনি রাগ ও ভয় দেখাতেও ভূললেন না | অবশেষে অর্জুন যুদ্ধ করতে রাজী হলেন , প্রচুর হত্যাও হলো | এই অর্থে গীতা কে যুদ্ধ ও হত্যার সমর্থক মানা হয় |
ভিন্ন মতে গীতা প্রমুখ ভাবে কোনো যুদ্ধ শাস্ত্রের গ্রন্থ নয় | যাঁরা গীতা তে ধর্ম, নীতি ও কর্তব্যের আলোচনা করেছেন তাঁরা যুদ্ধ কে প্রাধান্য দেননি| অর্জুন যুদ্ধ চাইতেন না এই তর্কও পুরোপুরি ঠিক নয়, কারণ তিনি কুরুক্ষেত্র মহা যুদ্ধের আগে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ করেছিলেন | তাঁর মনে উত্পন্ন সাময়িক ভ্রান্তি ও আত্মীয় -বিয়োগের বিষাদ উত্পন্ন হয়েছিল বলে কৃষ্ণ তাকে তার কর্তব্য বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে ধর্ম পালনের জন্য অণুদেশ দিচ্ছিলেন | তিনি যুদ্ধের জন্য প্রেরিত করছিলেন এটা ঠিক নয় | তদানিন্তন সমাজে যুদ্ধ সংস্থা স্বীকৃত ছিলো, আবার লোকেরা কৌরব - পাণ্ডব দের জানতেন | তাই শিক্ষাপ্রদ কিছু উপদেশ কে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পটভূমি এক আধার স্বরূপ দেওয়া হয় | যাতে গীতা এক লোক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে | তাই গিতোপদেশের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল অর্জুনের ভ্রান্তি দূর করে কর্তব্য পরায়ন করে তোলা | তাই যুদ্ধের অপরিহার্যতা বলা গীতার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না |
দুই তর্কের নিরিখে এই বলা যায় যে গীতা অহিংসারই সমর্থক | চোদ্দো অধ্যায়ে মানুষ কে আসুরিক বৃত্তি ছেড়ে নিজের সাতবিক গুণের চরম উত্কর্ষ ঘটিয়ে গুনাতীত হয়ে ওঠার্ প্রেরণা দেওয়া হয় | ষোলো অধ্যায়ে যে চব্বিস টি সত্ বৃত্তির বিবরণ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অহিংসাই মুখ্য | অহিংসার অপরিহার্যতা গীতার সর্বত্র বিদ্য়মান, একে ঈশ্বরের থেকে উদ্ভূত জ্ঞান ও তপের মুখ্য অংশ মানা হয় | গীতা তে বর্ণিত আদর্শ পুরুষের কোনো অংশেই হিংসার প্রতিফলন নেই | যে সমস্ত আসুরীক বৃত্তির কারণে হিংসা স্ফুরিত হয় পুরুষ রা তার থেকে অনেক দূরে ছিলেন | ওই সমস্ত বৃত্তি উচ্ছেদিত করলে জীবনে অহিংসা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে বাধ্য | যেখানে যেখানে প্রেয় কে শ্রেয় দিয়ে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা হয় সেখানেই অহিংসা প্রতিষ্ঠিত হয় |
আসলে গীতোপদেশের মূল সুরই অহিংসায় আপ্লুত | হিংসার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে কিছু বিচারক এটা মানেন যে হিংসার প্রয়োজনীয়তা কেবল সংহার কারী বৃত্তি হিসেবেই নয়, অপিতু সৃজনকারী বৃত্তি হিসেবেও আছে | এর প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণ এক জায়গায় বলছেন, "আমি কাল হয়ে লোকেদের কে নাশ করে থাকি| " [XI: ৩২]1 এই ধারণার এক পক্ষ পুর্বাগ্রহে গ্রসিত হয়ে এটা মানে যে আগে থেকে প্রস্তুত না হলে যেকোনো সমস্যা সমাধানে অহিংসা বৃত্তি যথেষ্ট নয় | তাই এটাই মূল প্রশ্ন যে অহিংসক থেকে কিছু মৌলিক সমস্যার সমাধান কিভাবে করা যায় | এই মর্মে মানুষের কিছু সত্ বৃত্তির প্রয়োজন হবে, আর কিছু প্রভাবশালী অহিংসা পূর্ণ সাধন খুঁজে নিতে হবে | এই সতপথের অনুসন্ধানে মহাত্মা গান্ধী অহিংসার শাস্ত্র ও শস্ত্রের সন্ধান পেয়েছিলেন | ব্যক্তিগত ও সামাজিক দুই স্তরেই দৈব সত্বৃত্তির পরিধি বাড়ে , অসুর বৃত্তি দুর্বল হয় ও অন্যায় দূর হয় তার জন্য অহিংসা ব্যতিরেকে আর কোনো পথ নেই | এর থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে অহিংসা কে ধর্ম আচরণের এক মুখ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা গীতা তে করা হয়েছে | আবার অহিংসা ও সত্যাগ্রহ গীতার মূল সুরের ই অংশ মাত্র | সত্যাগ্রহ অহিংসার দন্ড ভার আর অহিংসা হলো সত্যাগ্রহের যম - নিয়ম | এটাই গিতোপদেশের সার |
(৪) নিষ্কাম কর্ম ও কর্মযোগ
ফলের আশা ও কর্তা ভাব ছেড়ে দিয়ে কর্মরত থাকা কেই কর্মযোগ সাধনা হিসেবে মনে করা হয় | নিষ্কাম কর্ম যোগের বেশি আলোচনা গীতা তে হওয়ার কারণ হিসেবে মানুষের সেই পশ্চাতাপ কে বোঝানো হয়েছে যা কিনা কোনো কাজ না হবার জন্য অথবা অসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য ভুত - ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা তৈরি করে ও মন কে অশান্ত করে | তার ফলে বাইরের ও অন্তর মনের প্রবৃত্তি গুলি একত্র হতে পারে না আর আমরা আমাদের কাছে আসা কর্মের সহিত দত্তচিত্ত হতে পারি না | এর ফলে মানুষের জীবনে অশান্তি ও বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতি তৈরি হয় | এর ফলে মানুষ কে কিভাবে বর্তমান পরিস্থিতি তে কার্তব্য পথে চালিত করা যায় তা দুরূহ মনে হয় | গীতাবিদরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য নিষ্কাম কর্ম যোগের সিদ্ধান্ত উপস্থাপিত করেছেন | আমরা বুঝেছি যে গীতার আগে পূর্ব মীমাংসা তে সকাম কর্মের সিদ্ধান্ত ও সাংখ্য জ্ঞানে নিষ্কাম কর্ম সিদ্ধান্ত প্রতিপাদিত হয়েছে যা কর্ম ত্যাগ ও কর্ম সন্যাসের প্রেরণা দিচ্ছিল | আমরা এটাও দেখেছি যে সকাম কর্মবাদ যজ্ঞকান্ড তে পরিবর্তিত হয়ে সুখ প্রাপ্তি ও ভোগবাদ কে বাড়িয়েছে | কর্ম ত্যাগ ও কর্ম সন্যাসের প্রেরণা মানুষ কে কর্ম বিমুখ করার চেষ্টা করেছে |
গীতা তে প্রতিপাদিত নিষ্কাম কর্ম যোগের সিদ্ধান্ত এই সমস্যার সমাধানে করা হয়েছে | মুখ্য ধারণা এই যে ক্রমাগত নিষ্কাম কর্ম যোগের মাধ্যামে ব্যক্তি নৈশ্কর্ম্য হয়ে উঠবে ও মুক্তি পথের পথিক যবে | গীতা আসলে প্রবৃত্তি ( কর্ম ) ও নিবৃত্তি (জ্ঞান ) ভেদাভেদ মানে না | এতে সাংখ্য যোগ ও কর্ম যোগ কে একই উদ্দেশ্য প্রাপ্তির জন্য ভিন্ন পথ বলা হয়েছে | দুই পথে একই ফল প্রাপ্তি হয় | এই দুই যোগে সমদৃষ্টি রাখা কেই প্রকৃত দেখা বলা হবে |
আসলে গীতা জ্ঞান মার্গ থেকে কর্ম সন্যাস কে ছেড়ে দিলেও ফলাশা ও মোহ ত্যাগ কে স্বীকার করছে | তেমনি কর্ম বাদের মধ্যে কর্মের মহান আদর্শ কে রাখে কিন্তু সুখ প্রাপ্তির লালাসা কে ছেড়ে দেয় | এই ভাবে কাম্য -কর্ম সাধনা ও নিষ্কাম কর্ম সাধনার ভিতরে নিহিত পরস্পর বিরোধভাষী তত্ব কে প্রশমিত করে আর দুই ধারণার সার তত্ব কে স্বীকার করে | জ্ঞান ও কর্মের ভেদাভেদ প্রশামিত করার জন্য গীতা তে যজ্ঞ,কর্ম ও লোক সংগ্রহের নতুন পটভূমি দেয় |
বৈদিক নিয়মে যজ্ঞ কর্ম ও পুরূষার্থ কর্ম এই দুই এর মধ্যে যজ্ঞ কর্মবন্ধন তৈরি করে না | এখন গীতা র আলোকে সেই সমস্ত কর্মই যজ্ঞ অর্থে কর্ম যেখানে সর্বথা ফলের ও পরিনামের আশা ছেড়ে দিয়ে করা হয় | এই ধারণা তৈরি হলো যে কর্ম করলে নয় কর্ম ফলের আশা রাখলে কর্ম বন্ধন তৈরি হয় | এর ফলে যজ্ঞ অর্থে কর্ম ও পুরুষার্থ কর্মের ভেদ মিটল , সামান্য জীবিনে কর্মের গুরুত্ব বেড়ে উঠলো ; জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ ও নীতির ভেদ শেষ হতে লাগলো | কেবল এই শর্ত রাখা হলো যে কাজ করার সময় ফলের আশা ছেড়ে দিয়ে নিজের নির্ধারিত লক্ষ্যে মন কে চালনা করা উচিত | পরিবর্তিত পরিস্থিতি তে গীতা তে যজ্ঞ সম্পর্কিত অবধারণাও বিস্তৃত হয়ে কেবল কর্ম কান্ড কে যজ্ঞ না বলে ব্যাক্তি জীবনের সকল কর্ম কেই যজ্ঞ বলা হল | কেবল এই আশা রাখা হলো যে ফলের আশা ত্যাগ করে সমস্ত কর্ম ঈশ্বরের চরণে উত্সর্গ করা যেন হয় | গীতার তৃতীয় যুগান্তকারী বিচার হলো লোক সংগ্রহ | এর ফলে কর্ম যোগী ও জ্ঞান যোগীর ভেদ মিটে যায়, জ্ঞানী জন ও লোকসংগ্রহে লিপ্ত হলেন, জনগণের জন্য মুক্তির পথ প্রশস্ত হয়, সমাজে নিরন্তর কাজ করার প্রেরণা প্রসারিত হয় | কেবল সমৃদ্ধ জনই নয় সমস্ত জন যজ্ঞ করতে পারবেন এই বিশ্বাস বারে বারে গীতা তে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে | নিষ্কাম কর্ম সিদ্ধান্তের দ্বারা গীতা পরিস্কৃত ও বহিস্ক্তের ভেদ কে মিটিয়ে দেয় যা নিজের মধ্যেই এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ |
গীতা তে নিষ্কাম কর্ম সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা বোঝাতে গিয়ে অনেক তর্ক উপস্থাপিত করা হয়েছে | প্রথমত , শরীর ও সৃষ্টি কর্মময়, কর্ম প্রবাহ চলতে থাকে তাই কর্ম করা এক স্বাভাবিক ঘটনা | দ্বিতীয়ত, কর্ম বাদে শরীর ও সৃষ্টি কোনোটাই চলবে না | তৃতীয়ত যদি কেও বাহ্যিক ভাবে কর্ম ছেড়েও দেন তখন ইন্দ্রিয় ও মনের গুপ্ত স্তরে কর্ম চলতে থাকবে; এর ফলে সমাজে পাখন্ড ও অলীক বৃত্তি বাড়বে | চতুর্থ ত , পারিষ্কৃত জন কর্ম ত্যাগ করলে বহিষ্কৃত জন ও কর্ম থেকে দূরে সরে যাবেন; এই ভাবে সমাজে অসামঞ্জস্য ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হবার সাথে সাথে কর্ম বিমুখতা দেখা দেবে | পঞ্চমত , লোক সংগ্রহের কাজে ফলের আসক্তি ও ফলের আশা ছেড়ে দিলে কর্ম বন্ধন লাগে না | কর্ম সন্যাসের গুরুত্ব থাকলেও কর্ম যোগের পথ অধিক সরল ও সুগম , এই গীতা র মত |
স্বধর্ম ও স্বকর্মের গুরুত্ব গীতার নিষ্কাম কর্ম যোগের ই অন্য এক পর্যায় | গীতার মতে নিজ সমাজের সেবা করা, তাকে উন্নত করা মানুষের স্বধর্ম | স্বধর্ম পালনে মানুষের সামনে দুটি বাধা : প্রথমত , মানুষের স্বার্থান্ধ ও হীন বৃত্তি, অন্যটি হলো সমস্যাগ্রস্ত সমাজে স্বধর্মের অবনতি | এই পরিস্থিতি তে অপরের সম্পদের প্রতি আকর্ষন বাড়ে আর নিজ ধর্ম , স্বকর্মের ও কর্তব্যের প্রতি আকর্ষন কমে | এব্যাপারে অবগত থেকেই ঋষিরা গীতা তে স্বকর্ম নিয়ে এতো বেশি আলোচনা করেছেন | স্বধর্ম পালন ও স্বকর্মের কৃতির মাধ্যামে মানুষের ঈশ্বর প্রাপ্তি হয়ে থাকে | অপরের কর্তব্য কর্ম ভয়াবহ হয় , সেপথে যাওয়া থেকে মৃত্যু বরণ করে নেউয়া কে গীতা তে শ্রেয় মানা হয়েছে |
এক শংকিত সমাজের মতে গীতা তে কর্মবাদ ও কর্ম সন্যাসের ভিতরে যে সমন্বয় আনার চেষ্টা করা হয়েছে সেটি বাস্তব সম্মত নয় | সন্যাস থাকলে কর্মের প্রতি আকর্ষন শেষ হয়ে যাবে আবার কর্ম থাকলে অহম ও আশক্তি নষ্ট হবে না | অর্থাত্ দুই পথই ভিন্ন | এই তর্কের পক্ষে বলা হয়েছে যে কর্মের মূল প্রেরণা স্বার্থ , সুখ, দেহবাদ ও ভোগবাদের মধ্যে নিহিত | গীতার মতে সৃষ্টির সাথে একতা অনুভূত হলে কর্মের ফলাশক্তি, স্বার্থ ইত্যাদি বোধ নষ্ট হয়ে যায় | ওই পরিস্থিতি তে কৃত কর্মের সহিত লোক কল্যাণ, লোক সংগ্রহ ও লোক সেবা জুড়ে যাওয়ার জন্য কর্মের প্রতি অনুরাগ ও তা করার প্রেরণা অধিক গভীর হবে | এটা কর্মের ফলাশক্তি প্রশামিত না হলে সম্ভব নয়; অহম সরিয়ে অনাসক্ত হওয়া ততটাই জরুরী |
এখন এটাই প্রশ্ন যে লোক কল্যাণ ও লোক সংগ্রহ সতত কর্মের প্রেরণা হতে পরে কি? কয়েক জনের মতে যদি তাই হতো তাহলে মার্ক্সবাদী ধারায় যে সব দেশ কাজ করছিলো তাদের এতো দুর্গতি হতো না | সমূহিক স্বার্থ কে মূল স্বার্থ বানিয়ে নিয়ে কাজ করার মার্ক্সবাদী ধারণা ও লোক সংগ্রহের পরিকল্পনা পুরোপুরি ভিন্ন | মার্ক্সবাদী কর্মপ্রণালী বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ও দন্ড প্রণালীর আধারে হয় যা পশুর উপর প্রযোজ্য, কোনো সুসংস্কৃত মানুষের সম্প্রদায়ের উপর নয় | আত্ম প্রেরণা না থাকার জন্য ওই রূপ বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ও দন্ড প্রণালী থেকে মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে নেউয়ার জন্য উদ্যমি হয়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য ও পায় | অন্য দিকে লোক সংস্কৃতি বাহ্য কর্ম কে অন্তঃ প্রেরণার সাথে জুড়ে দেয় | এতে বাহ্য কর্মের কৌশল বাড়ে আর অন্তঃ প্রবৃত্তি সমূহের উদাত্তীকরণ হয় |
যাঁরা মার্ক্সবাদের পতন কে পুঁজিবাদের বিজয় হিসেবে দেখছেন তাঁরা লোক সংগ্রহের বিরুদ্ধে অন্য এক তর্ক প্রস্তুত করছেন | স্বার্থই মানুষের কর্ম প্রেরণা র মূল তা এই শতাব্দীর শেষ দশটি বছরে প্রমাণ হয়ে গেছে | এই তর্ক শৃঙ্খলা এক অঙ্গীয় ও এক পক্ষীয় কারণ এর ফলে চারিদিকে তৃষ্নার সাম্রাজ্য কায়েম হয়, প্রাপ্তের উপর অপ্রাপ্তের , পূর্ণের উপর অসম্পূর্ণের ভার পড়ে ; চারিদেকে অশান্তি, অস্থিরতা, নিরাশা , হতাশা ও বিফলতার স্থিতি উত্পন্ন হয় | সমাজে বৈষম্য বাড়ে , মর্যাদাহীনতা ছড়ায় ও পরিশেষে সমাজ ভাঙ্গে | ত্যাগ ও পরমার্থের প্রয়োজনীয়তা সমাজে সব সময় ই থাকবে তাই কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ কে পরিপন্থী করে কর্মের মূল প্রেরণা প্রতিফলিত ও বিকশিত হতে পারে না |
লোক সংগ্রহের প্রেরণা পুরোপুরি ভিন্ন ; এর পথ, পাথেয়, উদ্দেশ্য ও ফলাফলও ভিন্ন | এর সাথে চিত্ত -নিয়ন্ত্রণ, ইন্দ্রিয় নিগ্রহ, একত্ব - সমত্ব বোধের জ্ঞান, ক্ষর- অক্ষর , ক্ষেত্র - ক্ষেত্রজ্ঞ বোধ , জীব-সৃষ্টি ও ঈশ্বরের সম্পর্ক, আদি বিষয় যুক্ত | এই কাজ ব্যক্তিগত অভ্যাসের মাধ্যমে লোভ, ক্রোধ আর মোহ কে প্রশমিত করে সম্ভবপর হবে | মার্ক্সবাদ ও পুঁজিবাদে মেষ সদৃশ গতি আছে কিন্তু লোক সংগ্রহ দ্বারা কৃত কাজে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার মহত্ব আছে |
সংক্ষেপে বলা যেতে পারে যে কর্মে অন্তঃ প্রেরণা ও বাহ্যিক ব্যবস্থা সরল ভাবে গুরুত্ব পূর্ণ | অন্তঃ প্রেরণার অভাবে মানুষ যন্ত্রের মতো কাজ করে আত্ম গ্লানি ও অন্যান্য যন্ত্রণা পাবে, আবার বাহ্যিক ব্যবস্থার অভাবে অন্ত প্রেরণা বিশৃঙ্খলার বশবর্তী হয়ে পড়তে পারে | গীতা অন্তঃ প্রেরণা ও বাহ্যিক ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ ও সামঞ্জস্য ঘটিয়ে মানুষ কে উভয় সঙ্কট থেকে বাঁচায় | কর্ম যোগের সিদ্ধান্তের দ্বারা গীতা কর্ম কৌশল উন্নত করার প্রেরণা দেয় আবার কর্ম ফল ও অহমিকা ত্যাগ করার অণুদেশ দিয়ে পাপ - সন্তাপ থেকে বাঁচায় | এটাই গীতার কর্ম যোগের সর্বস্ব সার |
(৫) গীতা য় যজ্ঞ চক্র
বিশেষ উদ্দেশ্য প্রাপ্তির জন্য যজ্ঞ কারার কথা গীতা র পূর্বে ব্রাহ্মণ গন্থ সমূহেউল্লেখ করা হয়েছে | ওই সকল যজ্ঞ ইহ লোক ও পরলোকের সুখ ও সমৃদ্ধি পাওয়া পর্যন্তই সীমিত ছিলো | এটা সত্য যে পরবর্তী কালে মনু স্মৃতি (III: ৭৬ ) ও মহাভারতে শান্তি পর্বে যজ্ঞ থেকে বৃষ্টি, বৃষ্টি থেকে অন্ন উত্পাদন ও তার থেকে সমষ্টির ভরণ - পোষন হবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে |উপনিষদেও যজ্ঞ চক্রের পরোক্ষ চর্চা মেলে | চর্চা আজ থেকে শুরু হলেও যজ্ঞ চক্র কেবল ব্যক্তিগত সুখ ও সমৃদ্ধি পাওউয়া পর্যন্তই সীমিত ছিল |
কিন্তু গীতা তে কর্ম কাণ্ডের জন্য করা যজ্ঞ কে তূচ্ছা বলে সাংসারিক ঝুড় -ঝামেলা থেকে আলাদা থাকার পরামর্শ দেওয়া হয় | আলোচনা প্রসঙ্গে এক সময় কৃষ্ণ বলছেন যে আত্মজ্ঞানী পুরুষের সাথে বৈদিক কর্ম কাণ্ডের ততটাই সম্পর্ক থাকে যতটা বিস্তীর্ণ জল রাশির মালিক এক তৃষ্ণার্ত ব্যাক্তির সাথে কূপের থাকতে পারে | গীতার তৃতীয় অধ্যায়ে এই তর্ক দেউয়া হয় যে যথার্থ কর্মে কোনো কর্মবন্ধন হয় না , আর ব্যক্তি পরার্থ, পারমার্থ ও লোক সংগ্রহের সব কাজই করে থাকে | এক ভিন্ন তর্ক রাখতে গিয়ে এখানে বলা হয় যজ্ঞ থেকে বৃষ্টি হয়, বৃষ্টি থেকে অন্ন উত্পন্ন হয়, অন্ন দিয়ে সৃষ্টি চলে আর সেই যজ্ঞ কর্মের আধারে হয়ে থাকে | কর্ম প্রকৃতিতে অবস্থান করে আর প্রকৃতি অক্ষর ব্রহ্মে | আবার সেই অক্ষর ব্রহ্ম যজ্ঞে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে নিহিত থাকে | যজ্ঞ চক্রের বিষয় না বুঝে যারা কর্মরত থাকে তাদের জীবন পাপে পূর্ণ থাকে | অর্থাত্ সার্বজনিক কোষে কিছু না নিয়েই যারা ধার নেয়, প্রকৃত পক্ষে তারা চুরি করে |
গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে বিভিন্ন যজ্ঞের চর্চা করার সময় জ্ঞানযজ্ঞ কে শ্রেষ্ঠ মানা হয়েছে | এই ভাবে গীতাতে জীবনের প্রার্থ পারমার্থ সকল কর্ম কেই যজ্ঞ হিসেবে পরিগণিত করা হয়েছে | এর ফলে মানুষের কাছে সব কর্মই সমান ভাবে সমাদৃত হতে থাকে ও তাদের কর্ম তত্পরতা ও কর্ম কুশলতা বৃদ্ধি পায় | সমাজ রক্ষা ও সমৃদ্ধির সমস্ত কর্ম এই যজ্ঞ রূপ কর্মের ব্যাপ্তির ভেতরে সমাবিষ্ট হয়ে যায় | পূর্বে সাধনা সম্পন্ন ব্যক্তিরা যোগ মার্গে যেতেন আর সাধন সম্পন্নরা যজ্ঞ মার্গে | এখন গীতা তে সকলের জন্য সহজ , সরল ও সমতল কর্ম পথ বিদ্য়মান; নিষ্ঠা পূর্বক চললেই হলো | এটাই সাধারণ জনের উপর কৃষ্ণ কৃপার এক রূপ ও গীতা তে যজ্ঞ চক্রের সফল উপস্থাপন |
(খ ) গীতোপদেশের আধ্যাত্মিক পক্ষ :
গীতোপদেশের আধ্যাত্মিক পক্ষেরও আমরা পাঁচটি ভাগে আলোচনা করবো | এগুলি হলো: শরীর ও আত্মার ভেদ, ঈশ্বরবাদ, গীতার সৃষ্টি বিদ্যা, কর্ম স্বাধীনতা- প্রারব্ধ কর্ম ও ভগবত অনুকম্পা আর গীতা তে মোক্ষ সম্পর্কে ধারণা |
(১) শরীর ও আত্মার ভেদ :
গীতার মতে শরীর নশ্বর ও ক্ষণ ভঙ্গুর , অন্য দিকে আত্মা অবিনাশী ও অজর-অমর | শরীর কে ক্ষণ ভঙ্গুর বলে গীতা আসলে মানুষ কে দেহাভিমান থেকে মুক্ত করতে চায় | এই দেহাশক্তি থেকে মুক্তিই মানুষ কে জন্তু থেকে আলাদা করবে | যতোকম দেহাসক্তি ততো সুসংস্কৃত মানুষ | সংসারে যতো অত্যাচার, কদাচার ও আনচার তা এই দেহাসক্তির ও দেহাভিমানেরই জন্য | আত্মার ধারক ও সগুন রূপ হবার জন্য শরীর গুরুত্ব পূর্ণ | শরীর কে নির্মল করার মাধ্যামে তাতে অবস্থানকারী আত্মা ও চিত্ত কে বিশুদ্ধ করার জন্য মানুষ আগ্রহী হতে পারে | স্বধর্ম ও স্বকর্ম পালনের আধার শরীর হলেও তা সাধন স্বরূপ, সাধ্য নয় | শরীর জীবনের সবকিছু হতে পারে না | নিজের মধ্যে অন্য জীবাত্মা কে দেখা ও অন্য জীবাত্মার ভিতরে পরম সত্তা কে দেখা ই হলো স্থিত প্রাজ্ঞ, গুনাতীত জ্ঞানী জনের কাজ | দেহ অভিমান ও দেহ সর্বস্বতার মোহ থেকে নিজেকে উন্নত না করতে পারলে, আর দেহও আত্মার তফাত বুঝে নিয়ে আত্ম স্বরূপ কে তার প্রকৃত স্তরে না বুখতে পারলে সাধনা আত্মজ্ঞান থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে | দেহাভিমান থেকে উন্নীত হয়ে উঠবার পরেই আত্ম জ্ঞান, আর তবেই প্রজ্ঞা |
(২) ঈশ্বরবাদ
জগতের আধার সত্য নয় আর ঈশ্বরের মতো কোনো শক্তিও নেই, নাস্তিকদের এই ধারণা কে গীতা অস্বীকার করে | তাঁদের আরও মত যে ইচ্ছা ও তৃষ্নার সংযোগে সৃষ্টি হয় তাই অপৌরুষেয় সৃষ্টিকর্তা ও সত্যের কল্পনার বাস্তবে কোনো স্থান নেই | অন্য়দিকে গীতা র বিশ্বাস সেই পরম আরাধ্যের শক্তি ও ভক্তির মধ্যেই সমাবিষ্ট |
গীতা সাংখ্য পুরুষ ও বেদান্তের ব্রহ্মের মধ্যে সমন্বয় স্থাপিত করে , সাংখ্য দর্শনের পুরুষ ও প্রকৃতির বিচার কে নিজের মতো করে পরা ও অপরা প্রকৃতি হিসেবে উপস্থাপিত করে আর সেই পরা ও অপরা প্রকৃতি কেই ভূত মাত্রের উত্পত্তির কারণ হিসেবে প্রস্তুত করে | এই মর্মে ওই দুই প্রকৃতিই ঈশ্বরের রূপ, ব্রাহ্ম স্বরূপ | সাংখ্য ও গীতা উভয় মতেই প্রকৃতি হলো সমস্ত সৃষ্টির সর্জক ও ধারক | সাংখ্য পুরুষ ও বেদান্তের ব্রহ্ম ও আত্মা- পরমাত্মা স্বরূপে সমন্বয় স্থাপিত করার মাধ্যামে গীতা প্রকৃতি কে স্বাধীন মানে, পুরুষ কে নয় | এতে পুরুষের একই রূপ কে স্বীকার করা হয়েছে | আত্মা পরমাত্মার অংশ হলেও শরীরে আবদ্ধ, তাই তাকে নিজ স্বরূপের জ্ঞান করালেই মুক্তি | অবতার বাদ কে সমুচিত স্থান দিয়ে গীতা দুষ্টের দমনে ও সজ্জনের সাথে সাথে ধর্মের রক্ষনার্থে সময়ে সময়ে অবতারের জন্ম নিয়ে চলার কথা উপস্থাপিত করে | সাংখ্য, বেদান্ত, অবতারবাদ ও ব্রহ্মের মধ্যে সমন্বয় আনার সাথে সাথে গীতা তে বর্ণিত ব্রহ্ম অনেকাংশে ভিন্ন | সে বেদান্তের ব্রহ্মের মতো নির্গুন ও নিরাকার নয়, সে দুষ্ট নাশক, ধর্ম সংস্থাপক, সাধুদের পরিত্রাতা , সমাজের নিয়ন্তা ও প্রজা পালক |
গীতা এটা মানে যে ব্যক্ত এর তুলনায় অব্য়ক্ত আর সগুন এর তুলনায় নির্গুন সাধনা বেশি কঠিন | তাই গীতা সগুন উপাসনা কে সাধারণ জনের জন্য শ্রেয়স্কর মানে | ঈশ্বরের বিবিধ রূপ গীতা তে দেখা যায় ; তার অব্যক্ত, ব্যক্ত আবার সনাতন অব্যক্তও আছে, যা প্রলয় বা বিপর্যয়ের সময় ক্রিয়াশীল থাকে | এতো বিবিধ রূপে ঈশ্বরের স্বরূপ ব্যাখ্যা করার পেছনে গীতা র একটাই উদ্দেশ্য ; আপামর জনসাধারণের প্রত্যেকে যেন তাঁদের ধ্যান ধারণা অনুসারে ঈশ্বরের উপস্থিতি বুঝে নিয়ে ধর্মাচরণ করতে পারেন , আর তাঁদের জীবনে যেন সমাধান আসে |
(৩) গীতার সৃষ্টি বিজ্ঞান
আগে থেকে বিদ্য়মান সাংখ্য ও বেদান্তে র সৃষ্টি বিদ্যা ও মোক্ষ বিদ্যা কে স্বীকার করে তার মধ্যে যুগানুকূল পরিবর্ধন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন ঘটিয়ে সামঞ্জস্য আনার কাজ গীতা করেছে |
সাংখ্য ও বেদান্তে র সৃষ্টি বিজ্ঞানের মতে ত্রি গুণাময় প্রকৃতি থেকে সংসারের উদ্গম | মূল সাম্যাবস্থায় এই ত্রিগুণাময় প্রকৃতি অদৃশ্য, নিশ্চল, জাড়, অব্যক্ত ও অবিকসিত | সৃষ্টির দ্বিতীয় কারক তত্ব হিসেবে পুরুষ চেতন , ব্য ক্ত , বিকাসিত, সচলো সদৃশ | এই প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগে সৃষ্টির কাজ চলে | সৃষ্টির সমস্তপরাক্রম সৃষ্টির , পুরুষ ওই সৃষ্ট দেহে আবদ্ধ হয়ে দুঃখ- দুর্দশা ভোগ করে | পুরুষ যে সময় নিজেকে প্রযরতি থেকে ভিন্ন এক সত্তা হিসেবে বুঝে নিতে পারে সই সময় ই তার মুক্তি | অন্য দিকে বেদান্তে র সৃষ্টি বিজ্ঞান মতে সমস্ত সৃষ্টির মূল ই হলো ব্রহ্ম | সেই ভর্তা আবার সেই প্রলয় আনে | ব্রহ্মেরই সনাতন অংশ জীবাত্মা | কিন্তু ত্রগুণের আবেশে মানুষ আত্মা - পরমাত্মার একত্ব কে ভুলে যায় | যখন মানুষ আত্মার ওই বাস্তবিক রূপ বুঝতে পারে সেই সময় সে ব্রহ্মময় হয়ে মুক্ত হয় |
গীতা র বিভিন্ন অধ্যায়ে সৃষ্টি - প্রকরণ এলেও তার উপর বিশেষ ভাবে সপ্তম ও ত্রয়োদশ অধ্যায়ে রেখাপাত করা হয়েছে | সপ্তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে পাঁচ মহাভূত, মন , বুদ্ধি ও অহংকার পরমাত্মার অষ্টধা প্রকৃতির বিবিধ অংশ | এটি অপরা প্রকৃতি হিসেবে পরিগণিত | পরমাত্মার জ্যেষ্ঠ পরা প্রকৃতি জীব রূপে বিদ্য়মান | গীতার মতে ভূত মাত্রের উত্পত্তি এই পরা ও অপরা প্রকৃতির সম্মিলনে | গীতা এটাও মানে যে এই দুই প্রকৃতির মূলে পারমাত্মার ই অংশ বিদ্য়মান , তাই পরমাত্মাই সৃষ্টির ও মূল; আর এই ভাবে সেই জগতের সৃষ্টি বা বিনাশের কারক সত্তা, নিয়ন্তা ও পোষক | কেবল এটাই নয়, ত্রিগুণ পরমাত্মা থেকে উত্পন্ন হলেও তার থেকে ভিন্নও আলিপ্ত থাকে | গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ে পুরুষ ও প্রকৃতির সম্মিলন হলে সৃষ্টি অভিব্যক্ত হয় আর পুরুষ যখন নিজের অস্তিত্ব বুঝে নেয় তখনই মুক্তি - সাংখ্য শাস্ত্রের এই মান্যতা কে স্বীকার করা হয় | সাংখ্য মতে স্বীকৃত সৃষ্টির চব্বিসটি তত্ব কেও এখানে গীতা মান্য করে | কিন্তু পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈত স্বায়ত্ততা বোধের সাংখ্য ধারণা কে গীতা মানে না, বরং এই দু টি কেই ব্রহ্মের অংশ হিসেবে স্বীকার করে সেই অবিনাশী পরমাত্মার উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা জাহির করে | এই ভাবে গীতা সৃষ্টি বিজ্ঞানের বিষয়েও সাংখ্য - বেদান্তের ধ্যান ধারণার মধ্যে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করে |
সাংখ্য সম্পূর্ণ সৃষ্টি কে প্রকৃতির বিস্তার মানে যা ত্রিগুণের মধ্য সামঞ্জস্য বিঘ্নিত হলে পরে হয় | অন্য দিকে বেদান্ত সমস্ত সৃষ্টি কে ব্রহ্মের বিস্তৃত অভিব্যক্তি বলেই মনে করে; এই ক্রমে যদিও ব্রহ্ম নিজে নির্লিপ্ত থাকে | গীত সংসার কে এক বৃক্ষের সাথে তুলনা করে এই দুই ধারণা কেই জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে | ভোগ -লিপ্সা রূপ শাখা প্রশাখা যুক্ত অশ্বত্থ বৃক্ষের মূলে ব্রহ্মের অধিষ্ঠান | এখানেই সান্খ্যের প্রকৃতি ও বেদান্তের ব্রাহ্ম পরস্পর রূপে উদ্ভাসিত ও সংযুক্ত | এক দিকে গীতা পুরুষ - প্রকৃতির পৃথক হয়ে যাওয়া কে মোক্ষ দ্বার মনে করে , আবার অন্য দিকে মনে করে যে ব্যক্তি আত্মজ্ঞানী হয়ে ব্রহ্মজ্ঞানের দ্বারা ব্রহ্ম নির্বাণ পায় | প্রশ্ন সৃষ্টি বিদ্যার হোক বা মোক্ষ প্রাপ্তির , গীতা সাংখ্য - বেদান্ত সমন্বয়ে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ধ্যান ধারণা প্রস্তুত করে এক সমন্বয়াত্মক জাগতিক দৃষ্টি দেয় |
(৪) কর্ম স্বাধীনতা, প্রারব্ধ কর্ম ও ভগবদ অনুকম্পা
মানুষের কাছে এটা শাশ্বত প্রশ্ন যে তার জীবনে কর্মের স্বাধীনতা ও ভগবত অনুকম্পার কি কোনো ভূমিকা আছে ? সমন্বয় দৃষ্টি রেখে গীতা এটা মানে যে সত্ব, রজ ও তম - এই তিনটি গুণ ই মানুষের ব্যক্তিত্বের ভিত্তি, যার উপর মানুষের স্বভাব, কর্ম সংস্কার, কার্য কুশলতা ও বুদ্ধি-বিবেক নির্ভর করে | আসলে তম আলস্যের, রজ সক্রিয়তার ও সত্ব প্রকাশের রূপক | কিন্তু এর মানে এটাও নয় যে মানুষ এই তীন গুণের ক্রীতদাস আর এইগুলি থেকে মুক্ত হওয়া বা নিযন্ত্রেনে রাখা তার আয়ত্তের বাইরে | আমরা আমাদের চেষ্টা, স্বভাব ও সংস্কারের মাধ্যামে এই তীন গুণের পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও নিয়ন্ত্রণ খুব সহজেই করতে পারি | সত্ব গুণের মাধ্যামে উত্তম আচরণের ধনী হতে পারে আবার তীন গুণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে নির্বাণ পেতে পারে | এতে সবথেকে বেশি জরুরী হলো নিরন্তর প্রচেষ্টা ও নিষ্ঠার ও বৈরাগ্যের | এই পথে প্রচেষ্টা ব্যর্থ যায় না; ছোটো বড় সব চেস্টার ই সমতুল্য ফল | গীতা প্রারব্ধ কর্ম ও পুনর্জন্মের ধারণা কে জুড়ে দিয়ে কর্ম স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত কে আরও বেশি পরিপক্ব ও পরিষ্কার করেছে | এতে চেষ্টা র ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, যা মৃত্যুর কারণেও বিঘ্নিত হয় না | সঞ্চিত কর্ম কেবল ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগবে তা নয় সেই নিরিখে বর্তমান ও উজ্বল ও সম্ভাবন পূর্ণ হয় | আসলে প্রচেষ্টা প্রারব্ধের উপর প্রভাবি হতে পারে | প্রারব্ধ কর্ম আর পুনর্জন্মের সিদ্ধান্তে ব্যক্তির জন্মের কেবল স্থান, কাল ও পাত্রতা নির্ধারিত হতে পারে, কিন্তু কর্মের স্বাধীনতা থাকবে | স্বচেষ্টা ও সদিচ্ছার বলে সে আরও উন্নীত হতে পারে , আরও প্রবুদ্ধ হতে পারে এমন কি আরও সাত্বিক হয়ে উঠতে পারে | দৈব, অধিষ্ঠান, কর্তা , ইন্দ্রিয় ও চেষ্টা এই পাঁচ কারকের দ্বারা কর্ম পূর্তি হতে পারে | এই পথে ব্যক্তি নিজে নিজ কর্মের বিধায়ক হয়ে উঠতে পারবেন |
এখনও একটা সন্দেহ থেকেই যায়, প্রারব্ধ কর্ম 2 ও পুনর্জন্ম কি ভাগ্যবাদ ও নিয়তিবাদ কে সমর্থন করছে ? আমরা দেখেছি যে প্রারব্ধ কর্ম ও সঞ্চিত কর্ম পরস্পর বিপরীত হলেও প্রচেষ্টার অধীন, সেভাবেই সংশোধিত হতে পারে | এটাই সমীচীন যে বর্তমান কর্ম ভবিষযাতের প্রারব্ধ ও সঞ্চিত কর্ম হিসেবে অভিব্য়ক্ত হবে | প্রারব্ধ আমাদের প্রচেষ্টার ই পরিবর্তিত রূপ | তাই বলা যায় কর্ম সিদ্ধান্ত কোনো ভাবেই ভাগ্যবাদ ও নিয়তিবাদ কে সমর্থন করে না | গীতা এও স্পষ্ট করে যে মানুষের পরিণতি তার শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও চেস্টার অনুরূপে হয়ে থাকে | গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে আরও পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে যে মানুষ নিজের মানব আত্মার কাছ থেকে নিজের আত্মা কে উদ্ধার করুক | এতে মানুষের পুরুষার্থ ও প্রচেষ্টা অন্তর্নিহিত | কর্ম স্বাধীনতা ও ভাগবত ক্রিপার মধ্যে সানজস্য পূর্ণ তত্ব গীতার অন্তিম অধ্যায় গুলি তে লিপিবদ্ধ | সমস্ত জ্ঞান অর্জুন কে দেওয়ার পরে কৃষ্ণ বলছেন যে এখন অর্জুন সেটাই করুক যা তার উচিত ও সমীচীন বলে মনে হয় | আবার এটাও বলছেন যে সব ধর্ম ত্যাগ 3 করে তাঁর শরণে চলে আসতে হবে |
মানুষের নিজের চেষ্টা ও ঈশ্বর কৃপা এই দুই চাকার উপর নির্ভর করেই মানুষের জীবন যাত্রার রথ চলে | ভাষ্যকার দের মতে সর্ব ধর্ম পরিত্যাগ বলতে আসলে কৃষ্ণ ধর্ম ও অধর্ম দুটো কেই বুঝিয়ে দিয়েছেন | এই পথে ঈশ্বরের উপর আস্থা, বিশ্বাস, সমর্পণ রেখে কাজ করা যাওয়া , ফলের আশা না রাখা, মনে অকর্তা ভাব রাখা ইত্যাদির ভিতর দিয়ে ঈশ্বর কৃপাই প্রতিফলিত হয় | মানুষ কেবল মান ও শরীরের অধীন নয়, তার এক স্বাধীন সত্তা আছে, তাই সেই সত্তার বশবর্তী হয়ে সে কর্ম স্বাধীনতার জন্য সচেস্ট হতে পারে | ঈশ্বর কৃপার কাছে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ আদের ভেদ অর্থহীন হয়ে যায় | তাই স্ত্রী, দুরচারী , বিপথগামী সবার জন্য ঈশ্বর কৃপা পাওয়ার পথ থাকে; তাদের স্বচেষ্টা ও সদিচ্ছার নিরিখে তা পাওয়াও যায় | এই ভাবে ঈশ্বর কৃপা ও কর্ম স্বাধীনতা একত্রে ব্যক্তির জন্য প্রগতির পথ খোলা রাখে | মানুষের চেষ্টা, সন্শোধন, পরিমার্জন ইত্যাদির দ্বারা ই মানুষ ঈশ্বর কৃপার পাত্রতা পেতে পারে; স্বাভাবিক ভাবেই এটা কোনো টোটকা বা জাদু নয় ; এটাও মানুষের সদিচ্ছা, চেষ্টা ও আগ্রহের অধীন |
(৫) গীতা মতে মোক্ষ (মুক্তি )
সনাতন ধর্ম মতে , ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ - এই চার পুরুষার্থ | অন্য টীন পুরুষার্থর শেষ পরিণতি মোক্ষ তে এসে সমাহিত হয় বলে একে পরম পুরুষার্থ ও বলা হয়; এটাই মানুষের শেষ গন্তব্য ও অভীষ্ট | সাম্য বিধি অনুসারে প্রচলিত আছে যে মুক্তির দিনে ভগবান কর্ম ফলের উপর ভিত্তি করে স্বর্গ- নরকের নির্ধারণ করেন | কিন্তু সনাতন ধর্ম মতে আত্মা ও পরমাত্মার মিলন কে মোক্ষ দ্বার মনে করা হয়, যেখানে ব্যক্তি প্রকৃতি থেকে স্বাধীন ভাবে নিজের ব্রহ্ম স্বরূপের অস্তিত্ব ও নিরন্তরতা কে বুঝে নিয়ে জন্ম - মৃত্যুর চক্র থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারে | সব সৃস্টির মধ্যে ব্রহ্ম কে দেখে , "সর্ব ভূতাত্ম ভূতাত্মা 4 " -এই স্বরূপ কে জেনে নিয়ে সাধনার উন্নত স্তরে ব্যক্তি নিজেকে কর্ম বন্ধন ও পরিশেষে সংসার বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিতে পারে | এই দুই স্বরূপের মোক্ষ কে মান্য করে গীতা প্রথমটি কে ব্রহ্ম ভাব ও দ্বিতীয় টিকে ব্রহ্ম নির্বাণ বলেছে | আমরা আগেও দেখেছি যে গীতা র সমস্ত পুরুষ ই ব্রহ্ম ভাবে অবস্থান করেন, এদের যোগী, ব্রহ্মবেত্তা যোগী ও মুক্ত বলা হয়েছে | সর্বোপরি গীতা তে বর্ণিত পুরুষ যেভাবেই থাকুক না কেনো সে নিস্পৃহ, স্থির মতি, নিষ্কাম কর্মী, অনন্য ভক্ত, গুনাতীত ও ব্রাহ্ম লীন হয় |
এখানে একটি প্রশ্ন আমাদের জিগাস্য, কোন পথটি সরল ও সুগম ? গীতা মুক্তির তিন পথ - যথা জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির মধ্যে কোনো ক্রম বা শ্রেষ্ঠতার মাপকাঠি ব্যবহার করে না ; আর্থাত্ সব কটি পথ ই সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তম | আবার এই তিন পথকে আলাদা করে দেখাও, গীতা র মতে, সম্ভব নয় কারণ অন্য দুই পথের ব্যতিরেকে তৃতীয় কোনো পথে অগ্রসর হোওয়া সম্ভব নয় | অর্থাত্ জ্ঞানী কে কর্ম পথ ও ভক্তির মার্গ হয়ে সাধনা করেই এগোতে হবে | তিন পথ ভৌতিক ভাবে আলাদা মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে একই | এর সূক্ষ্ম স্তরে ধ্যান মার্গ ও স্বধর্ম পালন ও পরিগণিত | তাই কৃষ্ণ অর্জুন কে যোগী হয়ে যোগ সাধনার পরামর্শও দিচ্ছিলেন | কিন্তু গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে কৃষ্ণ অর্জুন কে বলেছেন: যার ফলে সমস্ত জগতের কাজ চলে আর যার থেকে সমস্ত জগত্ ব্যাপ্ত সেই পারামাত্মার আরাধনা করলেই জীবের মুক্তি (অধ্যায় ১৮ - শ্লোক ৪০ ) | বার বার গীতা এই মর্মে রেখাপাত করে যে মানুষ কে নিরন্তর আনাসাক্ত হয়ে ( অধ্যায় , শ্লোক ১৯) , পারমাত্মার স্বরূপ জেনে ( অধ্যায় ৪ , শ্লোক ৯ ) , জ্ঞানগণের নিরিখে বিশুদ্ধ হয়ে (অধ্যায় ৪, শ্লোক ১০ ) লোক কল্যানে কাজ করতে হবে ( অধ্যায় ৪, শ্লোক ৩৭ ) , ধ্যান সাধনা ও করতে হবে (অধ্যায় ৫, শ্লোক ২৪ ), তাকে ত্রিগুনের পার ও যেতে হবে ( অধ্যায় ১৪, শ্লোক ২০ ) আবার সাথে সাথে অনন্য ভক্তিও করতে হবে ( অধ্যায় ৬ , শ্লোক ৩৭ ও অধ্যায় ১১, শ্লোক ৫৫ ) |
এই সমস্ত ভাব কে একত্রিত করে তাকে অনন্য সাধারণ রূপে অনুসরণ করলে মানুষ ব্রহ্ম ভাবের অধিকারী হবে | (অধ্যায় ১৮, শ্লোক ৫১ - ৫৩ ) | ব্রহ্ম ভাবে লীন এই সব পুরুষ শরীর পাত হোওয়ার পরে শাশ্বত মোক্ষ পায় | সংসারে আসা যাওয়ার চক্র থেকে মুক্ত হয়ে ব্যক্তি পরম অমৃত পাও য়ার মাধ্যমে ব্রহ্ম নির্বাণ পায় |
(গ) উপসংহার
(১) গীতার সমন্বয় যোগ
উপরের আলোচনা থেকে আমরা এটা বলতেই পারি যে গীতা হোলো ভারতীয় মনীষার সমন্বয়বাদী ভাবনার ও সামর্থের চরম উত্কর্ষ | তাই এতে রাগ - বিরাগ, লোক -পরলোক, জ্ঞান - বিজ্ঞান , সূক্ষ্ম - স্থুল, পিন্ড- ব্রহ্মাণ্ড আদির মধ্যে সামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয় | অন্য দিকে যোগ শাস্ত্র, বেদ , উপনিষদ, ব্রাহ্মন. পুরাণ আদি প্রাচীন গ্রন্থের সর্ব প্রকারের প্রস্তুতির মাধ্যামে সামঞ্জস্য আনে | এই জন্য আমরা সমন্বয় যোগ কে গীতা র মূল সুর ও বার্তা বলে মেনেছি |সমন্বয় যোগ থেকে জীব জগতে ব্যাপ্ত সামঞ্জস্য. মাত্রা ভেদ, অনুপাত বুঝে নিয়ে তার নানা ক্ষেত্রে কাজে লাগানো বোঝায় |আমার মতে পিন্ড থেকে ব্রহ্মাণ্ড পর্যন্ত সবের মধ্যে স্থাপিত সামঞ্জস্য সর্বোপরি একটা চরম উত্কর্ষ |গীতার জ্ঞান পদ্ধতি তে সমন্বয় দৃষ্টি সর্বত্র পরিলক্ষিত হয় | পুরাতন ধারণা কে খন্ডিত না করে তার মধ্যে সমন্বয় আনাই গীতা র সফল ও কুশল প্রচেষ্টা | সামঞ্জস্য পূর্ণ ধারণা আনতে গীতা পুরাতন তত্ব গুলিকে এক সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছে | গীতা ইহলোক- পরলোক সম্পর্কিত ভেদ তত্ব কেও মানে না ; বাস্তব জীবনের সাথে পরম তত্ব সম্মিলিত করে এক ব্যাবহার কুশল সমন্বয় যোগ কে উপস্থাপিত করে | এতে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি পথের অদ্ভুত সমন্বয় পরিলক্ষিত | অতএব এই মত পোষন করা যেতে পারে যে গীতার সমন্বয় যোগ মূল ভারতীয় পরম তত্বের উচ্চ শিখর হলেও সাধারণ জনের জন্য প্রযোজ্য ও সরল বিধিতে সাধ্য | মানুষ কোনো মধ্য ব্যক্তির সাহায্য ব্যতিরেকেই এই পরম জ্ঞান কে যাতে পেতে পারেন তার জন্য গীতা তে কর্ম - ভক্তি, সগুন- নির্গুন উপাসনা, জীব জগত-ব্রহ্ম ইত্যাদি বিষয়ে এক সামঞ্জস্য পূর্ণ ধারণা দেয় |গীতা পাঁচ জ্ঞানের মিশ্রণে পঞ্চামৃত প্রসূত করে আমাদের সহিষ্ণুতা ও আত্ম বোধ দেয়, বোঝাপড়া শেখায় না ; সংঘর্ষ করতে শেখায় , পালাতে নয় ; অনাসক্তির মন্ত্র দেয়, উদাসীনতা নয় ; শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জাগায়, অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধকারে ফেলে না | বাস্তবে জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির ধ্যান ধারণা থেকে এই তিন ধারার ত্রিবেণী পর্যন্ত আমাদের সফর ই গীতা জ্ঞানযজ্ঞের সফর | এটা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যখন আমরা দেখি যে গীতা জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ ও ধ্যানযোগের মধ্যে যোগ সূত্র আনে ও ওই সকল ধারণা কে সহজ লভ্য করে |
নিষ্কাম কর্ম একত্ব - সমত্ব বোধের ব্যাতিরেকে সম্ভব নয় | ওই একত্ব - সমত্ব বোধ আবার জ্ঞানের ব্যাতিরেকে অসাধ্য | তাই বলা যেতে পারে গীতা জ্ঞান যোগ ও কর্ম যোগের মাঝে যোগসূত্র থাকার কথা বলে | লোক সংগ্রহের ধারণা দিয়ে গীতা এটাই বলতে চায় যে জ্ঞানীজন কেও কর্মরত থাকতে হবে | এটাই জ্ঞান ও কর্মের যোগসূত্রের কথা | নিষ্কাম কর্মের জন্য কর্তা ভাব ও ফলাসা থেকে তখন ই মুক্ত হয়ে ওটা যাবে যখন ভক্তি ভাব থাকবে ; এই ভাবে ভক্তি ও কর্মের মধ্যেও যোগ সূত্র স্থাপিত হয় | ইন্দ্রিয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বৃত্তি সমূহ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ইত্যাদির উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে একত্ব - সমত্ব বোধ তৈরি হো ওয়া সম্ভব নয়; সিএ কাংক্ষিত নিয়ন্ত্রণ ধ্যানের দ্বারা হয় | এভাবে জ্ঞান , কর্ম আর ধ্যানের যোগসূত্র সমন্বিত তত্ব পরিলক্ষিত | ঈশ্বর ও সৃষ্টির একত্ব বোধ ব্যাতিরেকে ভক্তিও সম্ভব নয়; তাই ভক্তি ও জ্ঞানের যোগসূত্রতা কায়েম হয় | এই মর্মে পরিশেষে জ্ঞান, কর্ম, ধ্যান ও ভক্তির যোগসূত্রতা কায়েম হচ্ছে তা অনুভব করা যায় | আমরা তাই শিব জ্ঞানে জীব সেবা করে থাকি | ঈশ্বর আরাধনা ব্যাতিরেকে একত্ব সমত্ব বোধ মনে আনা সম্ভব হয়ে ওঠে না |
সমস্ত আলোচনার পরেওকয়েকটা প্রশ্ন থেকেই যায় : গুহ্য জ্ঞান , এতো সব তত্ব, আত্ম তত্ব ইত্যাদি মানুষের জীবনে কতটা প্রযোজ্য? ওই সমস্ত জটিল সাধনা সাধারণ মানুষের পক্ষে কি সম্ভব ? এই সমস্ত প্রশ্ন নানাবিধ তর্ক বিতর্কের জন্ম দেয় | সংসারে অরাজকতা আগেও ছিল, আজ আছে আবার আগামী দিনেও থাকবে | তাই জন্য সমাজ ও ব্যাক্তি আদর্শ পথের পথিক হবে না তা মেনে নেওয়া কাঠিন | আস্থা ও বিশ্বাস সমাজের স্তম্ভ স্বরূপ ; ওই স্তম্ভ সমূহের আধারে স্মেজ অরাজকতা ও আদর্শ জীবনের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে | অরাজকতা কমিয়ে সার্বিক কল্যানের অভ্যাস করলেই সমাজ টিকে থাকবে | এই প্রসঙ্গে রিগ বৈদিক ঋষি বলেছেন , "সত্যেনোত্ত ভিতাভূমিঃ |5 " ওই মত আজকের আধুনিক যুগেও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক | সত্য কে বাদ দিয়ে সৃষ্টি চক্র চলা সম্ভব নয়; এই মর্মে ঋষি বচন আমাদের সদাই মনে রাখতে হবে :
অধর্মেণৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণি পশ্যতি
ততঃ সপত্নান্ জয়তি সমূলস্তু বিনশ্যতি।
--“অধর্মের দ্বারা আপাতত বৃদ্ধি পরিলক্ষিত করা যায়, সাময়িক মঙ্গল দেখা যায়, স্বল্পাবধির জন্য শত্রুরা পরাজিত হয়ে যেতে থাকে, কিন্তু সমূলে বিনাশ অবস্যম্ভাবী ও অপ্রতিরোধ্য |”
যুগ যুগ ধরে আমরা এই মহামন্ত্র কে বাস্তবায়িত হতে দেখে আসছি | সময়ে সময়ে বুদ্ধ, মহাবীর, যীশু, মূসা, মোহম্মদ, মহাত্মার মতো মহাপ্রাণ রা নিজের নিজের জীবনের আদর্শ দিয়ে এই সত্য বচন কে আরও দৃঢ ও বলিষ্ঠ করেছেন | তাঁদের সাফল্যের কথা শুনে ওই মঙ্গল বিচার কে সম্পূর্ণ রূপে বা আংশিক রূপে স্বীকার করার জন্য মন প্রস্তুত হয়, আগ্রহী ও তত্পর হয় |গীতা র ভাষা তেই বলা যায়, "এই পথে প্রত্যেক প্রচেষ্টার ই উপযুক্ত ফল আছে, কোণে চেষ্টাই ব্যার্থ যাবার নয় | এই পথে সামান্যতম প্রচেষ্টা মানুষ কে মহা ভয় থেকে মুক্ত করে | " ( অধ্যায় ২ . শ্লোক ৪০ )
দ্বিতীয় প্রশ্নে এই আশংকা দেখানো হয় যে যথাস্থিতি রাখার পক্ষ নেওয়ার সাথে সাথে গীতা কিভাবে যুগ পরিবর্তনের ও সমাজ পরিবর্তনের সমর্থন করবে ? এটা সত্য যে গীতা যথাস্থিতি রাখার পক্ষ নেয়, সাথে সাথে অন্যায় ও অবিচারের বিরোধিতা করাও শেখায় | গীতা র বিশ্বদৃষ্টি সমাজ পরিবর্তনের সমর্থন করে , গীতা অন্যায় কে সমাজ থেকে দূর করার কথা বলে ; এটা অহিন্সার পথে হবে নাকি হিংসার পথে সেটা আলাদা প্রশ্ন |গীতা তে সত্যের আধার অপৌরুষেয় হলেও স্থান ও কালের চক্রে আবদ্ধ, সে চিরন্তন ও শাশ্বতও | তাতে শ্রুতি ও স্মৃতির সত্য সমাবিষ্ট | এই মর্মে সত্যের নতুন ব্যাখ্যার সম্ভাবনা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে | অন্য ভাবে বলতে গেলে এর সার্ব ভৌম ও ক্ষেত্রীয় দুই পক্ষ ই বিদ্য়মান | গতানুগতিকতার সাথে সাথে পরিবর্তনের প্রবাহ কেও এই বিচার শৈলীতে সম্ভব করে তুলেছে | গীতা বুদ্ধি দীপ্ত মানুষ কে কর্ম স্বাধীনতার অধিকার দেয় | কর্ম সিদ্ধীর পাঁচ কারক, সাধন ও বিভিন্ন কর্ম কুশলতা কেও সমুচিত স্থান দেয় | ওই কর্ম স্বাধীনতাই পরিবর্তনের ভিত্তি | ব্যক্তি জীবনে তিন গুণের ভূমিকার সাথে সাথে ঈশ্বর কৃপার মহত্ব কেও গীতা মান্য করে | তার মানে এও নয় যে মানুষ পারমাত্মার হাতের পুতুল; সে সদিচ্ছা ও কর্ম কুশলতা , কর্ম স্বাধীনতা ও আত্ম জ্ঞানের আধারে কার্তব্য পালনে ব্রতী হবে ও ধ্যেয় পথে নিরন্তর অগ্রসর হতে থাকবে , আর ফলের আশা ত্যাগ করে কর্ম করে যাবে | অর্থাত্, স্বভাব, সংস্কার, সঞ্চিত কর্ম ও ঈশ্বর এই সীমা থাকা সত্বেও ব্যক্তি নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে যেন বিরত না হয়, যেন ভয় না পায় |
দৈব সম্পর্কিত পাঁচটা কারণ কে গীতা একটাই মানে | আসলে অভ্যুদয়ের যেকোনো মঙ্গল কার্য বুদ্ধি ও আত্মবিশ্বাসের সমন্বয়েই সাফল্যের সাথে করা যেতে পারে | এমন দেখা গেছে যে অধোগতির সময় ও এই দুই শক্তি একত্র হয়ে যায় ; সে পরিস্থিতি তে বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাসে আর বুদ্ধি দুর্বুদ্ধি তে পরিণত হয়ে যায় | এই ভাবে বিশ্বাস ও আস্থা বর্জিত স্বার্থান্ধ সমাজের কর্ম কান্ড চলতে থাকে | এতে মানুষ অল্প কাজ করে বেশি সুখ পাওয়ার চেষ্টা করে | এভাবে তারা কর্ম কাণ্ডের বিশ্বাস ও স্বার্থে অন্ধ বুদ্ধি এক উদ্দেশ্য পাওয়ার জন্য উদ্যত হয় | আমাদের দেশে সমস্ত সাধনার ভিত্তি হলো অন্ধ বিশ্বাস ও দুর্বুদ্ধি কে সরিয়ে আত্ম বিশ্বাস ,ঈশ্বরে আস্থা ও সদবুদ্ধি কে জাগরিত করে মানুষ কে সর্জনাত্মক মঙ্গল কার্যে প্রবুদ্ধ হতে সহযোগিতা করা | অসুর বৃত্তির স্থানে দৈবি বৃত্তি প্রতিষ্ঠিত করাই অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়স দুই পথের ই প্রধান উদ্দেশ্য | আর গীতাই এই সম্যক জীবন দর্শনের অধিষ্ঠাত্রী ও সত্ব স্বরূপা, যাতে সম্যক বুদ্ধি -বিশ্বাস, বুদ্ধিযোগ ও বিশুদ্ধ বৌদ্ধিকতার মহিমা পুনঃ পুনঃ বন্দিত হয়েছে | এইভাবে গীতা বেদের কর্ম কাণ্ডের অতিবাদ কে বার বার অস্বীকার করে আর মানুষ কে সাংসারিক বন্ধনে আবদ্ধ রাখার জন্য ওই কর্ম কান্ড কে দায়ী করে | বুদ্ধি -বিশ্বাসের সমন্বয়ের চরম উত্ কর্ষ গীতার শেষ অধ্যায়ে পাওয়া যায় | সেখানে এক দিকে কৃষ্ণ যেমন অর্জুন কে তাঁর শরণে আসার জন্য বলছেন তেমনি অন্য দিকে তাঁর দেওয়া জ্ঞান কে বিবেকের তুলাদন্ডে মূল্যায়ন করার পরে সেই মতো কর্ম করার জন্য বলছেন | এই কথা গুলি বৌদ্ধিকতা ও বিশ্বাসের চরম উত্ কর্ষের পরিচায়ক ,নাকি পরস্পর বিরুদ্ধ মতের |
(২) গীতোপদেশের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
ব্রাহ্মন কালের অতি বাদিতা ও উপনিষদ কালের জ্ঞানের রহস্য়ময় প্রস্তুতি মানুষের মনে যখন ভ্রান্তি উত্পন্ন করছিলো সেই সময় ওই সমস্ত সুধী জন কে ও সাধারণ মানুষ কে ভ্রান্তি ও শঙ্কা র পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করার জন্য গীতা এক সফল চেষ্টা করেছিলো | বৌদ্ধ কালের অধঃ পতনের সময় আদি শঙ্করা চার্য অদ্বৈত সিদ্ধান্তের সূত্রপাত করেহিন্দু সমাজে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন | এই প্রচেষ্টায় তাঁর গীতা ভাষ্য এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলো | মধ্য্জুগে পুনরায় রামানুজ , বল্লভাচার্যের মতো মহাপ্রাণরা গীতার মাধ্যামে সমাজ কে সমস্যাগ্রস্ত হো ওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন | এই শতাব্দী তে গান্ধী, তিলক, অরবিন্দ ও বিনোবা বিরচিত ভাষ্য ও তার আধারে বিরচিত প্রবন্ধ গুলি রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে এক বৌদ্ধিক পৃষ্ঠভূমি তৈরি করার কাজ করেছিলো | স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ওই সমস্ত রচনা ও ভাষ্য থেকে প্রেরণা নিয়ে দেশ মাতৃকা কে বন্ধন মুক্ত করবার জন্য তত্পর হন |
এই শতাব্দীর আর্থিক উন্নতি থেকে সমাজের এক অংশ উপকৃত হলেও অস্থিরতা , হিংসা, আঞ্চলিক ও জাগতিক সংঘর্ষ, ব্যা ভিচার ইত্যাদি সমস্যা গুলি মাথা চাড়া দিচ্ছে | আধ্যাত্মিক বিপন্নতা, নিজের এককিত্ব ও প্রাকৃতিক সম্পদের অপপ্রয়োগ আজ মানব অস্তিত্ব কেই সমস্যায় ফেলেছে | আজ মানব নির্মিত অধিকাংশ সংস্থাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে | পরিস্থিতি ক্রমাগত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে |
যুরোপীয় সভ্যতা থেকে উদ্ভূত উদারবাদী ও সমাজবাদী এই দুই শক্তি আজ তাদের রং - রূপ হারিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে | পশ্চিমী সভ্যতার নিরিখে নতুন কোনো বিশ্ব দৃষ্টি সৃজন করার কাজ বেশি দূর এগোতে পারেনি |আজকে সেই নতুন বিচারধারার খোজ করার জন্য মানুষের মন উদ্গ্রীব , তা প্রাসঙ্গিকও | সর্ব কালের সর্ব জনের জন্য উপযোগী বিচারে পূর্ণ হওয়ার কারণে গীতা সেই নতুন বিচার সন্ধানে মানুষের সহায়ক হতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস | গীতার ভিত্তি তে উত্পন্ন নতুন বিচারধারার পঞ্চশীল নিম্ন লিখিত হতে পারে :
অদ্বৈত : এক দার্শনিক ভিত্তি হোওয়ার কারণে অদ্বৈত মতে ভূত মাত্রের মূল স্বরূপ একই ; একই সৃষ্টি চক্রের অভিব্যাক্তি ও একই ইষ্ট দেবের ব্যাপ্তি | এই বিচারের আধারে মানুষে মানুষে , মানুষে অন্য জীবে ও বিবিধ সৃষ্টির স্বরূপে ভেদ মিটে যাওয়ার সাথে সাথে একত্ব - সমত্ব বোধ স্থাপিত হবে |এর বশবর্তী হয়ে উত্তম সমাজ, উত্তম ব্যাবস্থা ও উত্তম জীবনের সূত্রপাত সম্ভব হবে | পশ্চিম সভ্যতার ইতিহাসে সক্রেটিস থেকে মার্ক্স পর্যন্ত প্রত্যেকে দ্বন্দে পূর্ণ ব্যাবস্থা চিত্র সমাজ কে দিয়েছেন | এদের বিশ্ব দৃষ্টি তেই দ্বন্দ আর সংঘাত নিহিত, তার ফলে বিছিন্ন হয়ে সমাজ ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা বজায় থাকে | সংঘর্ষে বিজয়ী থাকার আগ্রহের বশবর্তী সমাজ রচনা শত্রু দমনের নিরিখে রূপায়িত হতে থাকবে ও রচনধর্মিতা শূন্য হবে | ফলে দৈবি সম্পদের হ্রাস ও আসুরিক সম্পদের বিকাশ হতে থাকে | সংঘর্ষময় পরিস্থিতি তে সত্তার কেন্দ্রীভূত হয়ে ওঠা পরিলক্ষিত হয় | এর ঠিক বিপরীতে অদ্বৈত বিচারে নির্মিত ও সর্জিত সমাজে মানবে - মানবে বাঁধান দৃঢ তো হবেই সাথে সাথে বিবিধ বিকাস সন্থার মধ্যে সমন্বয় স্থাপিত হবে | সমাজ নির্মাণে নানাবিধ রচনধর্মিতা পরিলক্ষিত হবে | একত্ব - সমত্ব বোধ বিকশিত না হলে মানব সমাজের কোনো বিকাস মুখী কাজ করা সম্ভব হয় না | এই ভাবনার আশ্রয় না নিলে মানুষ স্বার্থ থেকে পরোমর্থের দিকে এগোতে পারবে না |
মানব পরিপন্থী বিকাস : বিকাসের অসামঞ্জস্য পূর্ণ ব্যাবস্থার জন্য বঞ্চিত ও দরিদ্র নারায়ণের এক বিশাল দল বিরুদ্ধাচরণের জন্য প্রস্তুত | মানুষ এখন হিংসা ও হত্যার শিকার খুব সহজেই হয়ে যাচ্ছে | অসন্তোষ এতো বেশি যে বঞ্চিত বর্গ প্রশাসনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে রাজী নয় |স্বনির্বাসন, স্বাধর্ম রক্ষা ও অতৃপ্তি বুঝিয়ে দেবার সাথে সাথে তারা সমাজ ও ব্যাবস্থার উপর নিজেদের অনাস্থা নানাভাবে দেখিয়েছে | মানুষের সংভাবনা অনন্ত , কিন্তু সেই সম্ভাবনা কে বাস্তাবের পৃষ্ঠভূমিতে ফলপ্রসু করে তুলবার জন্য মানুষকে আত্মতত্ব বুঝে নিয়ে, নিজের স্বরূপ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান পেয়ে সেই ভাবে প্রবৃত্তি সমূহের উদারিকরণ ও উদাত্তিকরণ করার মাধ্যামে জীবন মূল্যগুলিকে নিজের জীবনে আনতে হবে | ভালো মানুষ ও উত্তম জীবন দৃষ্টির আধারে উত্তম সমাজ ব্যাবস্থা কে বাস্তবায়িত হতে দেখা যাবে |
মানব পরিপন্থী বিকাস প্রক্রিয়ার মূল তত্ব হতে পারে: দারিদ্র নির্মূলন, সাম্য প্রতিষ্ঠা, বিকল্প জীবন পদ্ধতির বিকাস, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষিত হতে পারে এমন বিকাস প্রণালীর রূপায়ন , পরিবেশে ভারসাম্য রাখার মতো কাজের পরিকল্পনা ও বিস্তার | একটা বিশ্ব বন্ধুত্বের ভাবনায় পূর্ণ বিশ্ব ব্যাবস্থা কে কার্যকর করার মধ্যে দিয়ে সমাজ সেই সম্যোক দৃষ্টি তে আপ্লুত এক সমাজ রচনার কাজ কে বাস্তবে রূপায়িত করতে পারবে যাকে আমরা সাম্য ভিত্তিক মানব সমাজ রচনার কেন্দ্রক বলে মানি |
স্বধর্মের গুরুত্ব : মানবাধিকারের কারণে ব্যাক্তি জীবন ও সমাজ জীবন আজ সমস্যাগ্রস্ত | সংঘর্ষ ও বিচ্ছিন্নতার পরিস্থিতি তৈরি হোওয়ার কারণ হলো মানুষের অধিকার সর্বস্বতা ও কর্তব্য শূণ্য়তা | মানবাধিকার বিচার, যা য়োরপের নব জাগরণ থেকে উদ্ভূত , এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে সাফল্যের চাবি হলো মানুষের স্বার্থ আর তা চরিতার্থ করার জন্য মানুষ চেষ্টা করতেই পারে | ওই স্বার্থেই নিহিত আছে সভ্যতার প্রগতির ক্রম | এই বিচার মানুষ কে কেবল দাবী আদায়ের জন্য সচেতন করেছে, কর্তব্য পরায়ণ করেনি, আন্দোলন করা শিখিয়েছে, সম্যক ও সমন্বয়ক দৃষ্টি দেয়নি | গীতা তে বর্ণিত স্বধর্মের সিদ্ধান্ত এক বিকল্প সমাজ ব্যবস্থার আধার স্তম্ভ হতে পারে | এর নিয়ত কর্মের গুরুত্ব কে ভিত্তি করে স্বধর্ম- স্বকর্মের পথে উত্তম সমাজ রচনার দিকে আমরা সাফল্যের সাথে এগোতে পারবো |
শান্তি : ব্যক্তিগত স্তরে অশান্তির মূল কারণ হলো দৈব সম্পদের হ্রাস ও আসুরিক সম্পদের বিকাস | তাই শান্তি অভিযানের সূচনা ব্যক্তি জীবন থেকেই হবে | এই ভিত্তি তেই একত্ব -সমত্ব বোধ প্রস্থাপিত হবে | জাগতিক স্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা তখন ই সম্ভব যখন মানুষ সৃষ্টি কে ঈশ্বরের বিভূতি মেনে নিয়ে তার আদর -সম্মান করে, তার সেবা করে, তার পরিবর্ধন ও পরিমার্জনে ব্রতী হয় | অন্য ভাবে বলতে গেলে সর্বত্র একত্ব - সমত্ব বোধের মাধ্যামে শান্তি বহাল হবে |
সত্যাগ্রহ ও অন্যায় উন্মূলন : সমাজ ও ব্যাবস্থা যেমন ই হক না কেনো অন্যায় ও অবিচার কে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয় | তার মাত্রা ভেদ হতেই পারে | প্রশ্ন ওঠে যে সমাজে সঞ্চিত অন্যায় ও অবিচারের মোকাবিলা কিভাবে করা যায় |
মানব ইতিহাসে সমাজ পরিবর্তনের তিনটি অস্ত্র হল : আইন , হিংসা ও কারুণা | আইন ও হিংসার সীমা তো সবাই জানে, কিন্তু করুণার ও নিজস্ব সীমা ও প্রতিবন্ধকতা আছে | কারুণা কেবল রচনা ও সেবা পর্যন্ত সীমিত থাকে | তাই কারুণা মূলক সত্যাগ্রহের মাধ্যমে সমাজ থেকে অন্যায় উন্মূলন সম্ভব হতে পারে | গিতোপদেশ আধুনিক সমাজে আরও নানা ভাবে নিজের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে | আধুনিক সমস্যা সমাধানে গীতপদেশ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও সম্যক জ্ঞান কাজে লাগতে পারে | এর থেকে যুগান্তকারী বিচার নির্গমনের সম্ভাবনাও প্রবল |
1 অধ্যায় ১১ শ্লোক ৩২:
মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেহপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেহপি যান্তি পরাং ||
অর্থাত্, হে পার্থ! যারা আমার উপর বিশেষভাবে আশ্রয় করে, তারা স্ত্রী, বৈশ্য, শুদ্র আদি নিম্ন কূল থেকে উত্পন্ন হলেও বিনা বাধায় অবিলম্বেই . উর্ধ্ব গতি লাভ করে |
2 অতীতের কোনো কাজ যা বর্তমান জীবন কে প্রভাবিত করতে পারে তাকে প্রারব্ধ কর্ম বলা যেতে পারে| এটি সঞ্চিত কর্ম ফলের ই এক প্রকার যা ফল দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে ও ব্যাক্তি জীবন কে প্রভাবিত করে |
3 গীতাশ্লোক ১৮/৬৬ঃ
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।
অর্থাত্, সর্বধর্ম পরিত্যাগ করে আমার শারণে এসো; আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব, তাই অযথা শোক করো না।
4 অধ্যায় পাঁচ, শ্লোক ৭:
যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ।
সর্বভুতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে।।৭।।
অর্থাত্, যোগযুক্ত জ্ঞানী বিশুদ্ধ বুদ্ধি, বিশুদ্ধ চিত্টের অধিকারী ও জিতেন্দ্রিয় জন সমস্ত জীবের প্রিয়ভাজন হো ওয়া সত্বেও কৃত কর্ম করে নিএজকে নিরলিপ্ত ভাবেই রাখেন , নিজেকে তার বান্ধানে থেকে দূরে রাখেন |
5 সত্যেনোত্তভিতা ভূমিঃ সূর্যেপোত্তভিতা দৌঃ।
প্রসঙ্গ: অথর্ববেদ–সংহিতা — চতুর্দশ কাণ্ড, প্রথম অনুবাক, প্রথম সূক্ত , বিবাহ–প্রকরণম;
সত্যের দ্বারাই সূর্য, আকাশ, পৃথিবী ও চন্দ্রামা অবস্থান করছে | সোমের দ্বারা ধরণী পূজিত ও সত্যের বলয়ে বিরাজ করছে |