সমস্ত কাজ প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা হয়ে থাকলেও অজ্ঞানী জন মনে করেন তাঁরাই করছেন ( III : ২৭)
সমস্ত প্রাণি, এমন কি জ্ঞানী জন ও, প্রকৃতি - প্রবৃত্তি অনুসারে কাজ করেন | তাই জিদ করে প্রকৃতি - প্রবৃত্তি দমনে কি লাভ ? ( III: ৩৩)
হে অর্জুন! প্রকৃতি থেকে উত্পন্ন ত্রিগুন অব্য়ায় ও আবি নাশি আত্মা কে শরীরে বেঁধে নেয় | নির্মল, প্রকাশময় ও সুখকর সতগুণ ব্যক্তি কে জ্ঞান ও সুখের টানে বাঁধে ; রাগ , তৃষ্ণা ও আসক্তি দিয়ে রাজগুণ বাঁধে | আবার অজ্ঞান, প্রমাদ , আলস্য , নিদ্রা ও মোহ দিয়ে তমোগুণ ব্যক্তি কে বন্ধনে আবদ্ধ করে | (XIV: ৫-৮)
অভয়, আত্মসুদ্ধি, বুদ্ধি, জ্ঞান যোগে নিষ্ঠা, দান, ইন্দ্রিয়-নিগ্রহ, যজ্ঞ, স্বাধ্যায়, তাপ , সরলতা, অহিংসা, সত্যনিষ্ঠা, আক্রোধ, ত্যাগ, শান্তি, অনিন্দা , দয়া, বিষয়ে নীলিপ্ততা , মৃদুতা, অনুচিত কাজে লজ্জা, স্থিরতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, পরিচ্ছন্নতা ও নিরভিমান বৃত্তি হলো দিব্য সম্পদে পূর্ণ মানুষের লক্ষণ | (XVI: ১-৩)
হে অর্জুন! অসুর বৃত্তি সম্পন্ন মানুষের স্বভাবে দম্ভ, মেজাজ, অভিমান, রাগ, অজ্ঞান ও কটু ভাব থাকে| (XVI:৪)
কাম ক্রোধ ও লোভ নরকের পথ বলে মানুষের স্বভাব নষ্ট করে | তাই ওগুলি ত্যাগ করা উচিত |( XVI: ২৭)
সাত্বিক লোকেদের স্বাস্থ্য বর্ধক, পুষ্টিকর , সুখকর, রুচিকর , রসযুক্ত ও স্নিগ্ধ আহার প্রিয় | কটূ, টক, নোনা, গরম ও শুকনো আহার রাজসিক লোকেদের প্রিয় | তামসিক লোকেদের শুকনো, গরম, ঝাল, বাসী ও নিষিদ্ধ আহার প্রিয় | (XVII : ৮-১০)
দেবতা, দ্বিজ, গুরু ও জ্ঞানী জনের পূজা , পরিচ্ছন্নতা, সরলতা, ব্রহ্মচর্য পালন, আর অহিংসা কে শারীরিক তপ বলে | কথার মধ্যে দিয়ে উদ্বেগ ও দুঃখ প্রকাশ না হয়ে সত্য, প্রিয় , কল্যানকারী ও স্বাধ্যায় পূর্ণ বাণী সৃজিত হয় তাকে বাচিক তপ বলে | মনের নির্মলতা, প্রসন্নতা, মৌন, আত্মসংযম ও বিচারে সমৃদ্ধি কে মানসিক তপ বলে | (১৭:১৪-১৬)
দেশ, কাল ও পাত্র কে দেখে সমুচিত দান যা কর্তব্য মনে করে ও বিনিময়ে কিছু না পাওয়ার কথা ভেবে করা হয় তাকে সাতবিক দান বলে | বিনিময়ে কিছু পাওয়ার ইচ্ছা রেখে দূখের সহিত দেওয়া দান কে রাজসিক দান বলে | ভূল স্থানে, ভূল সময়ে ও ভূল পাত্র কে তিরস্কারের সহিত দেওয়া দান কে তামসিক দান বলে | (১৭:২০-২২ )
আসক্তি, ফলাশা ও রাগ-দ্বেষ ব্যতিরেকে কৃতকর্ম কে সাত্বিক কর্ম বলে | কষ্ট করে দম্ভের সাথে কামনা পূরণের জন্য করা কাজ কে রাজসিক কর্ম বলে | পরিণাম, ক্ষতি ও সামর্থের কথা না ভেবে কৃত কর্ম কে তামসিক কর্ম বলে | (XVIII:২৩-২৫)
হে অর্জুন! যারা বন্ধন -মুক্তি, কর্তা -অকর্তা, কার্তব্য- অকর্তব্য , প্রবৃত্তি- নিবৃত্তি ইত্যাদি যথার্থ রূপে বুঝতে পারে তারা সাত্বিক বুদ্ধি সম্পন্ন | যারা ধর্ম -অধর্ম, কর্তব্য-অকর্তব্য যথার্থ রূপে বুঝতে পারে না তাদের বুদ্ধি কে রাজসিক বুদ্ধি বলা হবে | যারা ধর্ম কে অধর্ম মনে করেন ও অন্যান্য সব বৃত্তি কে বিপরীত অর্থে বোঝেন তাঁদের বুদ্ধি তামসিক প্রকৃতির | (XVIII: ৩০-৩২)
হে অর্জুন! এবার আমার কাছে তিন রকম সুখের কথা শোনো | প্রথম দিকে বিষ সদৃশ মনে হলেও পরিশেষে সুখকর আনন্দ দায়ক, অমৃত রূপ, আত্মজ্ঞানে পূর্ণ সুখ কে সাত্বিক সুখ বলে | ইন্দ্রিয় - জনিত ভোগ বৈভব থেকে উত্পন্ন প্রথমে অমৃতের মতো কিন্তু পরিশেষে বিষ সদৃশ সুখ কে রাজসিক সুখ বলা হবে | নিদ্রা ও প্রমাদ প্রদান কারী যে সুখ আত্মা কে মোহে অন্ধ করে তা তামসিক বৃত্তি সম্পন্ন | (XVIII : ৩৫-৩৯)
হে অর্জুন, পৃথিবীর কোনো প্রাণী ও স্বর্গের কোনো দেব প্রকৃতির এই তিন গুণ থেকে মুক্ত নন | (XVIII : ৪০ )
যজ্ঞ চক্র
হে অর্জুন যজ্ঞকর্ম বাদে অন্য যে কোনো কর্মে বন্ধন উত্পন্ন হয় , তাই তুমি নিস্প্রিহ হয়ে কাজ করো | (৩:৬)
সৃষ্টির আদিতে যজ্ঞ করে প্রজাদের সৃজন করার সময় প্রজাপতি বললেন , "নিজ উন্নতির জন্য তোমরা যজ্ঞ করো আর যজ্ঞ ও তোমাদের মনের মতো ফল দেবে | এর মাধ্যামে তোমরা ও দেবরা পরস্পরের পোষন করতে থাকো আর উপকৃত হও |" প্রতিদান না দিয়ে যারা ঈশ্বর প্রদত্ত সম্পদের ভোগ করে তারা অবশ্যই চোর | (৩:১০-১২)
হে অর্জুন! অন্ন থেকে প্রাণী মাত্রের উত্পত্তি, বৃষ্টি থেকে অন্ন, যজ্ঞ থেকে বৃষ্টি , কর্ম থেকে যজ্ঞ, প্রকৃতির গুণে কর্মের উত্পত্তি আর অক্ষর ব্রহ্ম থেকে প্রকৃতির উত্পত্তি হয় | এই ভাবে যজ্ঞ চক্রের সাতত্য কে যে সঠিক ভাবে অনুপালন না করে সেই পাপাত্মা , ইন্দ্রিয়-দাস মানুষের জীবন ব্যর্থ | (৩:১৪-১৬)
যজ্ঞ ও লোকসংগ্রহের ভাবনা নিয়ে অনাসাক্ত ও আত্মনিষ্ঠ হয়ে কাজ করলে তার সমস্ত কর্ম বন্ধন লুপ্ত হয় | (৪: ২৩)
ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবিব্র্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্।
ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা।। ( IV:২৪ )
ব্রহ্ম কাজে অর্পণ, হবি, যজ্ঞকর্তা ও যজ্ঞ অগ্নি -সবই ব্রহ্ম | ব্রহ্মরূপ কর্মে রত যোগীরই ব্রহ্ম প্রাপ্তি হয় | (IV:২৪)
যজ্ঞ , দান ও তাপ - এই তিনটি কাজ কোনো পরিস্থিত্তেই ত্যাজ্য নয়, বরং সাধক ও সিদ্ধ দুজনের জন্য ই পবিত্র | তবে এই সকাল কর্ম ও আসক্তি ও ফলের আশা ট্যাগ করে কারা উচিত | (XVIII:৫-৬)