বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

হৃদয়ে ভগবান



শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন—“বিশ্বসৃষ্টির পূর্বে ব্রহ্মা বিরাট রূপের ধ্যান করার মাধ্যমে ভগবানের সন্তুষ্টি বিধান করে তাঁর লুপ্ত চেতনা ফিরে পেয়েছিলেন এবং এই বিশ্ব প্রলয়ের পূর্বে ঠিক যেমন ছিল ঠিক সেইভাবে তার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”

“বৈদিক ধ্বনির দ্বারা প্রদর্শিত পথ এতই মোহময়ী যে, মানুষের বুদ্ধি স্বর্গ আদি অর্থহীন বিষয়ে ধাবিত হয়। বদ্ধ জীব স্বর্গলোকে অলীক সুখভোগের স্বপ্নে আবিষ্ট হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই সমস্ত স্থানে সে কোনরকম প্রকৃত সুখ আস্বাদন করতে পারে না। 

 

অতএব তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি উপাধিসমন্বিত এই জগতে কেবল নূন্যতম আবশ্যকতাগুলির জন্য প্রয়াস করবেন। তাঁর কর্তব্য বুদ্ধিমত্তা সহকারে স্থির হওয়া এবং কখনো অবাঞ্ছিত বস্তুর জন্য কোন রকম প্রয়াস না করা, কেননা তিনি ব্যবহারিকভাবে উপলব্ধি করেছেন যে, সেই সমস্ত প্রচেষ্টা কেবল অর্থহীন পরিশ্রম মাত্র। 

 

ভূমিরূপ শয্যা থাকতে শয়নের জন্য খাট এবং পালঙ্কের কি প্রয়োজন? বাহু থাকতে উপাধানের কি প্রয়োজন? আর যখন অঞ্জলি বর্তমান, তখন বহুমূল্য পাত্রেরই বা কি প্রয়োজন? দিক্ ও বৃক্ষ বল্কলাদি থাকতে বস্ত্রের কি প্রয়োজন? পথে কি কোন জীর্ণ বস্ত্র পড়ে নেই? অন্যদের পালন করার জন্য যাদের অস্তিত্ব, সেই বৃক্ষরা কি আর ভিক্ষা দান করছে না?

 

 

নদীগুলি কি শুকিয়ে গেছে, যার ফলে তারা আর তৃষ্ণার্তকে জলদান করছে না? পর্বতের গুহাগুলি কি রুদ্ধ হয়ে গেছে, এবং সর্বোপরি সর্বশক্তিমান ভগবান কি শরণাগতকে আর রক্ষা করছেন না? তা হলে জ্ঞানবান মুনিঋষিরা কেন ঐশ্বর্যের গর্বে অন্ধ এবং প্রমত্ত ব্যক্তিদের তোষামোদ করতে যায়? 

 

এইভাবে স্থির হয়ে তাঁর সর্বশক্তিমত্তার প্রভাবে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমাত্মার সেবা করা কর্তব্য। যেহেতু তিনি সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভগবান, নিত্য এবং অন্তহীন, তিনিই জীবনের পরম লক্ষ্য এবং তাঁর আরাধনার ফলে মানুষ সংসারের হেতুরূপ অবিদ্যাকে দূর করতে পারে। 

 

ঘোর জড়বাদী ছাড়া আর কে পারমার্থিক বিষয়ে চিন্তা না করে অনিত্য বিষয়ের চিন্তা করবে? দুঃখ-দুর্দশার নদী বৈতরণীতে পতিত হয়ে তাকে স্বীয় কর্মজাত ত্রিতাপ ভোগ করতে হয়, তা দেখা সত্ত্বেও পশু ছাড়া আর কোন্ ব্যক্তির বিষয়ে স্পৃহা হবে? 

 

অন্যেরা (যোগীরা) তাঁদের দেহের অভ্যন্তরস্থ হৃদয় গহ্বরে বিরাজিত চতুর্ভুজ শঙ্খ-চক্র-গদা পদ্মধারী প্রাদেশমাত্র ধারণার দ্বারা স্মরণ করে থাকেন। তাঁর মুখমণ্ডল তাঁর প্রসন্নতা ব্যক্ত করছে। 

 

তাঁর চক্ষুদ্বয় কমল দলের মতো আয়ত, এবং তাঁর বসন কদম্ব পুষ্পের কেশরের মতো পীত বর্ণ এবং তিনি বহু মূল্যবান রত্নসমূহের দ্বারা বিভূষিত। মহারত্নখচিত স্বর্ণময় কিরীট ও কুণ্ডল মহামূল্যবান মণিসমূহের দ্বারা দীপ্তিমান। 

 

তাঁর শ্রীপাদপদ্ম মহান্ যোগীদের বিকশিত হৃদয় পদ্মের কর্ণিকারূপ আবাসে সংস্থাপিত। তাঁর বক্ষস্থলে শ্রীবৎস চিহ্নযুক্ত কৌস্তুভ-মণি শোভা পাচ্ছে এবং তাঁর স্কন্ধে নানাপ্রকার রত্নসমূহ, এবং তাঁর গলদেশ অম্লান শোভা সমন্বিত বনমালায় বেষ্টিত।

তাঁর কটিদেশ মেখলার দ্বারা এবং অঙ্গুলিগুলি বহুমূল্য রত্ন খচিত অঙ্গুরীর দ্বারা সুশোভিত। তাঁর অন্যান্য অঙ্গ নূপুর, কঙ্কণ আদি বহু মূল্যবান অলঙ্কারে সুসজ্জিত। তাঁর মুখমণ্ডল কুঞ্চিত স্নিগ্ধ অমল নীলবর্ণ কেশের দ্বারা অতিশয় শোভমান এবং হাস্য দ্বারা পরম মনোহর। 

 

ভগবানের উদার লীলা এবং হাস্যযুক্ত কটাক্ষপাতে যে চমৎকার ভ্রূভঙ্গী দীপ্তিমান হয়, তাতে তাঁর অত্যন্ত অনুগ্রহ পুর্ণরূপে সূচিত হয়। তাই যতক্ষণ ধ্যানের দ্বারা মনকে নিবদ্ধ করা যায়, ততক্ষণই ভগবানের এই দিব্য রূপের উপর মনকে স্থির করা উচিত। 

 

ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম থেকে শুরু করে তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডলের ধ্যান করা উচিত। প্রথমে তাঁর শ্রীপাদপদ্মে মনকে স্থির করা উচিত, তারপর গুলফ, তারপর জঙ্ঘা এবং এইভাবে উচ্চ থেকে। উচ্চতর অঙ্গের ধ্যান করা উচিত। 

 

চিত্ত যত শুদ্ধ হবে, ধ্যান ততই গভীরতা লাভ করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত স্থূল জড়বাদীদের জড় এবং চেতন উভয় জগতেরই দ্রষ্টা, পরমেশ্বর ভগবানে প্রেম ভক্তির উদয় না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কর্তব্যকর্ম সম্পাদনের পর যত্নপূর্বক ভগবানের বিরাট রূপেরই ধ্যান করা উচিত।”

“হে রাজন, যোগী যখন এই মনুষ্যলোক ত্যাগ করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর উচিত উপযুক্ত স্থান এবং কালের চিন্তায় উদ্বিগ্ন না হয়ে সুখকর আসনে উপবিষ্ট হয়ে প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সমূহকে মনের দ্বারা সংযত করা। তারপর, যোগীর কর্তব্য হচ্ছে তাঁর নির্মল বুদ্ধির দ্বারা তাঁর মনকে আত্মায় লীন করা এবং তারপর আত্মাকে পরমাত্মায় বিলীন করা। 

 

তার ফলে পূর্ণরূপে তৃপ্ত জীব তৃপ্তির পরম অবস্থা লাভ করে অন্য সমস্ত কার্যকলাপ থেকে বিরত হন। সেই লব্ধোপশাস্তি স্তরে, স্বর্গের দেবতাদেরও নিয়ন্ত্র ও সংহারকারী কাল কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না, আর সামান্য দেবতা—যারা প্রাকৃত জগতেই কেবল আধিপত্য করেন, তাঁরা কি প্রভাব বিস্তার করবেন? 

 

সেখানে সত্ত্ব, রজো অথবা তমোগুণ এবং অহঙ্কার তত্ত্ব, জড় কারণ সমুদ্র, প্রধান বা প্রকৃতির কোনই প্রভাব নেই। যথার্থ পরমার্থবাদীরা জানেন যে, পরম পদে সব কিছুই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই তাঁরা যা কিছু ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন তা পরিত্যাগ করেন। 

 

ভগবানের সঙ্গে পূর্ণ প্রীতির সম্পর্কে সম্পর্কিত শুদ্ধ ভক্তরা তাই কখনো বৈষম্যের সৃষ্টি করেন না, পক্ষান্তরে তাঁরা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মকে হৃদয়ে ধারণ  করে সর্বক্ষণ তাঁর আরাধনা করেন। এইভাবে মুনিরা ব্রহ্ম স্বরূপে অবস্থিত হয়ে শাস্ত্রজ্ঞানের প্রভাবে বিষয় বাসনাসমূহ সমূলে বিনষ্ট করে পাদমূলের দ্বারা মূলাধারকে রুদ্ধ করেন, 

 

এবং প্রাণবায়ুকে ষটস্থানে উন্নীত করে তাঁদের জড় দেহ ত্যাগ করেন। ধ্যানপরায়ণ ভক্ত নাভি থেকে প্রাণবায়ুকে হৃদয়ে, তারপর সেখান থেকে কণ্ঠের অধোদেশস্থিত বিশুদ্ধ চক্রে নিয়ে যাবেন। তারপর জিতচিত্ত মুনি বুদ্ধির দ্বারা অনুসরণ করে তাকে ধীরে ধীরে তালুমূলে নিয়ে যাবেন। 

 

তারপর ভক্তিযোগী তাঁর প্রাণবায়ুকে ভ্রূ-দ্বয়ের মধ্যে চালিত করে প্রাণবায়ুর বহির্গমনের সাতটি পথ, অর্থাৎ শোত্রদ্বয়, নেত্রদ্বয়,  নাসিকাদ্বয় ও মুখগহ্বর রুদ্ধ করে তাঁর প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে তাঁর লক্ষ্য স্থির করবেন। তিনি যদি সমস্ত  জড় ভোগবাসনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হন, তাহলে তিনি ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করে সমস্ত জড় সম্পর্ক পরিত্যাগপূর্বক পরম গতি প্রাপ্ত হবেন।”

 

“হে রাজন, যোগীর যদি ব্রহ্মপদ, অষ্টসিদ্ধি, অথবা  বৈহায়সদের সঙ্গে অন্তরীক্ষে ভ্রমণ করার বাসনাদি জড়ভোগের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তা হলে তিনি দেহত্যাগের সময় মন ও ইন্দ্রিয়সমূহকে ত্যাগ না করে সেগুলি সহ সেই সেই লোকে ভোগার্থে গমন করবেন। 

 

পরমার্থবাদীরা চিন্ময় শরীর লাভের প্রয়াসী। ভগবদ্ভক্তি, তপশ্চর্যা, যোগ এবং দিব্য জ্ঞানের প্রভাবে তাদের গতি জড় জগতের অন্তরে এবং বাহিরে অপ্রতিহত। সকাম কর্মীরা, অথবা জড়বাদীরা কখনো সেই প্রকার অপ্রতিহত গতিতে গমনাগমন করতে পারে না। 

 

হে রাজন, এই প্রকার যোগীরা প্রথমে ছায়াপথে ব্রহ্মলোকের মার্গস্বরূপ জ্যোতিমন্ত্রী সুষুম্না নাড়ীর যোগে অগ্নির দেবতা বৈশ্বানর লোকে যান। এখানে তারা সম্পূর্ণরূপে কলুষ-বিধৌত হয়ে আরও ঊর্ধ্বে শিশুমার চক্রে যান, যেখানে তাঁরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির সঙ্গে সম্পর্ক লাভ করেন। 

 

এই শিশুমার সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের আবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু, এবং তাকে বলা হয় শ্রীবিষ্ণুর (গর্ভোদকশায়ী বিষ্ণুর নাভি। যোগীরাই কেবল শিশুমার চক্র অতিক্রম করে মহলোক প্রাপ্ত হন যেখানে ভৃগু প্রভৃতি মহর্ষিরা ৪,৩০,০০,০০,০০০ সৌর বৎসর ব্যাপী দীর্ঘায়ু উপভোগ করেন। 

 

এই গ্রহলোকটি আধ্যাত্মিক স্তরে অধিষ্ঠিত ঋষিদেরও পূজ্য। কল্পান্তে যখন অনস্তদেবের মুখাগ্নির দ্বারা লোকত্রয় দগ্ধ হয়, তখন তিনি শুদ্ধ মহাত্মাদের বিমানে করে সত্যলোকে গমন করেন। সত্যলোকের আয়ুষ্কাল ১,৫৪,৮০,০০,০০,০০,০০০ সৌর বৎসর। 

 

সত্যলোকে শোক, জরা, মৃত্যু, দুঃখ, উদ্বেগ এই সমস্ত কিছুই নেই, কেবল চেতনা জনিত এক প্রকার দুঃখ রয়েছে। সেই দুঃখের কারণ এই যে, ভগবদ্ভক্তি সম্বন্ধে অজ্ঞ জড় জগতের বদ্ধ জীবদের অশেষ দুঃখ দর্শন করে তাদের প্রতি তাঁদের করুণার উদ্রেক হয়। 

 

সত্যলোক প্রাপ্ত হওয়ার পর ভক্ত নির্ভীকভাবে বাহ্যত স্থূলদেহসদৃশ একটি সূক্ষ্ম দেহে প্রবেশ করেন এবং ক্রমান্বয়ে মৃত্তিকাত্ব থেকে জলমূর্তি প্রাপ্ত হন এবং তার জ্যোতির্ময় মূর্তি এবং বায়বীয় মূর্তি প্রাপ্ত হন, এবং অবশেষে আকাশ রূপ প্রাপ্ত হন।

 

 এইভাবে ভক্ত ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য গন্ধ, রসনেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য রস, চক্ষুর গ্রাহ্য রূপ, ত্বকের গ্রাহ্য স্পর্শ, শ্রবণেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য আকাশের গুণ শব্দ, কর্মেন্দ্রিয়ের গ্রাহ্য জড় ক্রিয়া আদি সমূহকে অতিক্রম করেন।

 

 

এইভাবে ভক্ত স্থূলভূত, সুক্ষ্মভুত ও ইন্দ্রিয়সমূহের লয় স্থান এবং সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক অহঙ্কার প্রাপ্ত হয়ে সেই অহঙ্কারের সঙ্গে বিজ্ঞান তত্ত্ব বা মহৎ তত্ত্বে গমন করেন, এবং তারপর তিনি শুদ্ধ আত্ম-উপলব্ধির স্তরে উন্নীত হন। 

 

সম্পূর্ণরূপে যিনি পবিত্র হয়েছেন, কেবল তিনিই তাঁর স্বরূপ প্রাপ্ত হয়ে পূর্ণ আনন্দ এবং তৃপ্তির সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গলাভ করতে পারেন। যিনি ভগবদ্ভক্তির এই পূর্ণতার স্তর লাভ করেছেন, তিনি আর কখনও এই জড় জগতের প্রতি আকৃষ্ট হন না এবং এখানে ফিরে আসেন না।”

“হে রাজন, আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি যা বললাম তা বেদের বর্ণনা বলে জানবেন এবং তা নিত্য সত্য। ব্রহ্মার আরাধনায় তুষ্ট হয়ে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে তা বলেছিলেন। ব্রহ্মাণ্ডে ভ্রাম্যমাণ জীবদের ভগবানের প্রেমময়ী সেবার পন্থা ব্যতীত ভববন্ধন মোচনের আর কোন মঙ্গলময় পন্থা নেই।”

“মহাত্মা ব্রহ্মা, গভীর মনোনিবেশ সহকারে একাগ্রচিত্তে তিনবার বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন, এবং তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করে স্থির করেছিলেন যে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকর্ষণই হচ্ছে ধর্মানুষ্ঠানের পরম পূর্ণতা। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে অন্তর্যামীরূপে বিরাজ করেন। দর্শন দ্বারা এবং বুদ্ধি দ্বারা বিচারপূর্বক সেই সত্য অনুভব করা যায়।”

“হে রাজন, তাই প্রতিটি মানুষের কর্তব্য হচ্ছে সর্বত্র এবং সর্বদা সেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির শ্রবণ, কীর্তন ও স্মরণ করা। যাঁরা ভক্তদের অত্যন্ত প্রিয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথামৃত কর্ণকুহরের দ্বারা পান করেন, তাঁরা বিষয় ভোগে দূষিত অন্তঃকরণকে পবিত্র করেন এবং ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের সমীপে গমন করেন।”


কলি যুগ

 


সূত গোস্বামী বললেন—“সেখানে উপস্থিত হয়ে মহারাজ পরীক্ষিৎ দেখলেন যে, এক শূদ্র রাজবেশ ধারণ করে একটি দণ্ডের দ্বারা অনাথবৎ একটি গাভী ও বৃষকে প্রহার করছে। বৃষটি শ্বেতপদ্মের মতো শুভ্রবর্ণ।

 

 শূদ্রের প্রহারে সে এমনি ভয়ভীত হয়ে পড়েছিল যে, মূত্র ত্যাগ করে কম্পিত হচ্ছিল এবং এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

 

গাভীটি ধর্মস্রাবী হওয়ার ফলে অত্যন্ত শুভদা হলেও তিনি যেন দীনা এবং বৎসহীনা। শূদ্রটি তাঁর পদে আঘাত করছিল। তাই তাঁর নয়ন অশ্রুসিক্ত এবং তিনি অত্যন্ত কৃশা হয়ে তৃণ ভক্ষণ করবার জন্য আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছিলেন।"

সুবর্ণখচিত রথে আরূঢ় হয়ে, ধনুর্বাণে সুসজ্জিত মহারাজ পরীক্ষিৎ সেই শূদ্রকে বজ্রগম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন—“তুই কে? বলবান হওয়া সত্ত্বেও তুই এই পৃথিবীতে আমার আশ্রিত অসহায়দের হত্যা করতে সাহস করছিস?

 

 

তুই নটের মতো রাজবেশ ধারণ করেছিস্ বটে, কিন্তু তোর কার্যকলাপ ক্ষত্রিয় নীতির বিরোধী। শ্রীকৃষ্ণ গাণ্ডীবধারী অর্জুনসহ দুরে প্রস্থান করেছেন বলে তুই কি নির্জনে নিরপরাধ প্রাণীকে বধ করতে সাহস করছিস্? তার ফলে তোর যে অপরাধ হয়েছে, তাতে তুই বধের উপযুক্ত।”

মহারাজ পরীক্ষিৎ তখন বৃষটিকে জিজ্ঞাসা করলেন—“আপনি কে? আপনি কি মৃণালশুভ্র কোন বৃষ, না কোনও দেবতা? আপনি তিনটি চরণ হারিয়েছেন এবং মাত্র এক পদে নির্ভর করে বিচরণ করছেন। 

 

আপনি কি কোনও দেবতা বৃষরূপ ধারণ করে আমাদের ছলনা। করছেন? কৌরবশ্রেষ্ঠ বীরদের ভুজ বলে সুরক্ষিত কোনও রাজ্যে এই প্রথম আপনাকে অশ্রুজলে অনুতপ্ত হতে দেখলাম। 

 

এখনও পর্যন্ত এই পৃথিবীতে রাজকীয় অবহেলার ফলে কারও অশ্রুপাত হতে দেখা যায়নি। হে সুরভীনন্দন, আপনার আর শোক করার প্রয়োজন নেই। নিম্নশ্রেণীর শূদ্রটিকে ভয় পাওয়ারও দরকার নেই। 

 

আর, হে গোমাতা। আপনিও আর রোদন করবেন না। দুষ্টদের শাসনকর্তা আমি জীবিত থাকতে আপনার মঙ্গলই হবে। হে সাধ্বি, যে রাজার রাজ্যে প্রজারা অসৎ‍ ব্যক্তিদের দ্বারা সন্ত্রস্ত হয়, সেই দুরাচার নরপতির যশ, পরমায়ু সৌভাগ্য ও পরলোকে উৎকৃষ্ট পুনর্জন্মাদি সবই নাশ প্রাপ্ত হয়। 

 

উৎপীড়িতদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করা অবশ্যই রাজার পরম ধর্ম, তাই আমি অতীব জঘন্য এই মানুষটির প্রাণ অবশ্যই সংহার করব, কারণ সে অন্যান্য প্রাণীদের প্রতি হিংস্র হয়ে উঠেছে।”

তিনি (মহারাজ পরীক্ষিৎ) সেই বৃষটিকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন—“হে সুরভীনন্দন, কে আপনার তিনটি পা ছেদন করেছে? পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অনুবর্তী রাজাদের রাজ্যে আপনার মতো দুঃখ ত আর কারও হয়নি?”

“হে বৃষ, আপনি নিরপরাধ এবং সম্পূর্ণ সাধু প্রকৃতির; তাই আপনার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল হোক। দয়া করে আপনি আমাকে বলুন কোন্ দুষ্টজনে আপনার অঙ্গ ছেদন করেছে, যার ফলে পৃথাপুত্রদের যশ ও কীর্তি কলুষিত হচ্ছে? 

 

যারা নিরপরাধ জীবের কষ্টের কারণ, এই জগতের সর্বত্রই আমি তাদের কাছে ভয়ের কারণ। দুর্বৃত্তদের দমনের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে যে কেউই সাধুগণের কল্যাণ সাধন করেন। যে দুর্বৃত্ত নিরপরাধ জীবের প্রতি হিংসা করে অপরাধী হয়েছে, সে যদি স্বর্গের বর্ম-অলংকৃত সাক্ষাদ্ দেবতাও হয়, তবু আমি তার বাহু ছেদ করে ফেলব। 

 

যারা শাস্ত্রের অনুশাসন অনুসারে নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন, তাঁদের পালন করা এবং যখন জরুরী অবস্থা থাকে না, তখনও যারা শাস্ত্রবিধি উল্লঙ্ঘন করে আপৎশূন্য স্বাভাবিক কালেও বিপথগামী হয়, তাদের যথাশাস্ত্র তিরস্কার করাই শাসনকারী রাজার পরম ধর্ম।”

ধর্মরাজ বললেন—“যে পাণ্ডবদের ভক্তিভাবময় গুণবৈশিষ্ট্যাদিতে বিমুগ্ধ হয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পর্যন্ত দৌত্যাদি কর্তব্যকর্ম পালন করেছিলেন, আপনি সেই পাণ্ডবদেরই বংশধরের মতো উপযুক্ত কথাই বলেছেন। 

 

হে নরশ্রেষ্ঠ, কোন্ বিশেষ দুরাচারী যে আমাদের দুঃখ দুর্দশা ঘটিয়েছে, তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন, কারণ বহু মতাবলম্বী দার্শনিকদের বিভিন্ন সব অভিমতের দ্বারা আমরা বিমুগ্ধ হয়ে গেছি। কিছু দার্শনিক যাঁরা সব রকমের দ্বৈতভাব অস্বীকার করেন, 

 

তাঁরা প্রচার করেন যে, জীব নিজেই নিজের সুখ-দুঃখের জন্য দায়ী। অন্যেরা বলে যে, অতিমানবীয় শক্তিই সুখ-দুঃখের জন্য দায়ী। 

 

আবার অন্যেরা বলে যে, কর্মই সুখ-দুঃখের কর্তা; তেমনি আবার জড়বাদীরা বলে যে, স্বভাব বা প্রকৃতি আমাদের সুখ-দুঃখের পরম কারণ। 

 

কিছু মনীষী আছেন, যাঁরা বিশ্বাস করেন যে, যুক্তি বিচারের সাহায্যে দুঃখ শোকের কারণ নির্ণয় করতে কেউ পারে না, বা কল্পনার সাহায্যেও তা জানতে পারে না, অথবা ভাষায় প্রকাশ করতেও পারে না।  হে রাজর্ষি, আপনার নিজের মনীষার সাহায্যে এই সকল বিষয়ে চিন্তা করে আপনি নিজেই বিচার করুন।” 

 

সূত গোস্বামী বললেন—“হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, এইভাবে মহারাজ পরীক্ষিৎ ধর্মরাজের কথা শ্রবণ করে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হলেন এবং নির্ভুল ও বিগতমোহ হয়ে তিনি তার উত্তর দিলেন।” 

 

মহারাজ পরীক্ষিৎ বললেন—“হে বৃষরূপধারী ধর্মজ্ঞ। ধর্ম শাস্ত্রে বলা হয় যে, অধার্মিক বা পাপাচারীর যে স্থান লাভ হয়, অধর্ম নির্দেশকেরও সেই স্থান লাভ হয়ে থাকে। 

 

সেই জন্য আপনার অনিষ্টকারীকে জেনেও আপনি তার পরিচয় দিচ্ছেন না, সুতরাং নিশ্চয়ই আপনি সাক্ষাৎ ধর্ম বৃষরূপ ধারণ করেছেন মাত্র। 

 

এইভাবে দৈবী মায়ার গতি নিশ্চয় জীবেদের মন এবং বাক্যের অগোচর, এতে কোনও সন্দেহ নেই। সত্যযুগে তপস্যা, শৌচ, দয়া ও সত্য রূপ তোমার চারটি পা প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু এখন আমি দেখছি যে, অহঙ্কার, স্ত্রীসঙ্গ এবং নেশাজনিত মত্ততা রূপে বর্ধমান অধর্মের প্রভাবে তোমার তিনটি পা ভগ্ন হয়েছে। 

 

এখন আপনি সত্যরূপ একটি মাত্র পায়ের উপর ভর করে কোন মতে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু এই অধর্মরূপী কলি ক্রমশ প্রবঞ্চনার দ্বারা সংবর্ধিত হয়ে আপনার ঐ পদটিও ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। 

 

পরমেশ্বর ভগবান এবং অন্যেরা অবশ্যই পৃথিবীর ভার হরণ করেছিলেন। তিনি যখন এখানে অবতরণ করেন, তখন তাঁর মঙ্গলময় পদচিহ্নের প্রভাবে সর্বতোভাবে পৃথিবীর মঙ্গল সাধিত হয়েছিল। 

 

দুর্ভাগ্যবশত পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক পরিত্যক্তা হয়ে সাধ্বী ধরিত্রী, ‘আমাকে ব্রাহ্মণ বিদ্বেষী শূদ্রেরা রাজা হয়ে ভোগ করবে'—এই বলে শোক করতে করতে অশ্রু ত্যাগ করছিলেন। 

 

এইভাবে মহারথী (সহস্র শত্রুর সঙ্গে এককভাবে সংগ্রাম করতে সক্ষম) পরীক্ষিৎ, ধর্ম এবং পৃথিবীকে সান্ত্বনা দান করে, অধর্মের কারণ স্বরূপ কলিকে সংহার করার জন্য তীক্ষ্ণ খড়গ গ্রহণ করলেন। 

 

কলি যখন দেখলেন যে, রাজা তাকে বধ করতে উদ্যত, তখন ভয়ে বিহ্বল হয়ে সে তার রাজবেশ পরিত্যাগ করে তাঁর পদতলে অবনতমস্তকে নিপতিত হয়ে আত্মসমর্পণ করল। 

 

দীনবৎসল, শরণাগত পালক, যশস্বী মহাবীর মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে চরণতলে নিপতিত দেখে কৃপাবশত তাকে বধ করলেন না এবং যেন ঈষৎ হাস্য করতে করতে বলতে লাগলেন, 'আমরা অর্জুনের যশের উত্তরাধিকারী; 

 

তাই তুমি যখন কৃতাঞ্জলিপুটে আমার শরণাগত হয়েছ, তখন আমি তোমাকে বধ করব না, কিন্তু তুমি আমার রাজ্যের কোন স্থানে থাকতে পারবে না, কেননা তুমি অধর্মের প্রধান সহচর। 

 

কলি বা অধর্মকে যদি রাজা বা রাষ্ট্রনেতারূপে আচরণ করতে দেওয়া হয়, তা হলে অবশ্যই লোভ, মিথ্যা, চৌর্য, অসভ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্ভাগ্য, কপটতা, কলহ ও দত্ত প্রভৃতি অধর্মসমূহ প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাবে। 

 

অতএব, হে অধর্মবন্ধু! পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য যেখানে সত্য ও ধর্মের ভিত্তিতে যজ্ঞ বিস্তারনিপুণ যাজ্ঞিকেরা যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন, সেই ব্রহ্মাবর্ত প্রদেশে তোমার থাকা উচিত নয়।

 

 

যজ্ঞে যদিও কখনও কখনও কোন দেবতা পূজিত হন, তথাপি সেই পূজার মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবানেরই পূজা হয়ে থাকে, কারণ তিনি স্থাবর ও জঙ্গম সকলেরই আত্মা এবং তিনি বায়ুর মতো সকলেরই অন্তরে ও বাইরে অবস্থিত।  সেই ভগবান শ্রীহরি যজ্ঞের দ্বারা সন্তুষ্ট হয়ে যাজ্ঞিকদের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল সাধন করেন।' "

শ্রীসূত গোস্বামী বললেন—“এইভাবে মহারাজ পরীক্ষিৎ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে কলি ভয়ে কাঁপতে লাগল। তরবারি হস্তে তাকে বধ করতে উদ্যত পরীক্ষিৎ মহারাজকে তখন তার কাছে যমরাজের মতো মনে হয়েছিল। 

 

তখন সে মহারাজ পরীক্ষিতকে বলতে লাগল, ‘হে পৃথিবীর একমাত্র সম্রাট, আপনার আজ্ঞানুসারে আমি যেখানে বাস করব বলে মনস্থ করছি, সেখানে আমি ধনুর্বাণসহ আপনাকে দেখতে পাচ্ছি। 

 

অতএব, হে ধার্মিক-শ্রেষ্ঠ, আপনি এমন কোন স্থান নির্দেশ করুন, যেখানে আমি স্থিরচিত্তে আপনার আজ্ঞা পালন করতে পারি।'

সৃত গোস্বামী বললেন—“কলির এই আবেদন শ্রবণ করে মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে যেখানে দ্যুত ক্রীড়া, আসব পান, অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ এবং পশু হত্যা হয়, সেই সেই স্থানে থাকবার অনুমতি দিলেন। 

 

কলি (উক্ত চতুর্বিধ স্থান পাওয়া সত্ত্বেও) পুনরায় স্থান প্রার্থনা করলে মহারাজ পরীক্ষিৎ তাকে সুবর্ণে বসবাসের অনুমতি প্রদান করলেন।

কেননা যেখানেই সুবর্ণ সেখানেই মিথ্যা, মত্ততা, কাম এবং হিংসা বর্তমান। অধর্মাশ্রয় কলি, উত্তরানন্দন পরীক্ষিতের আজ্ঞা শিরোধার্য করে তাঁর দেওয়া সেই পাঁচটি স্থানে বাস করতে লাগল। 

 

অতএব যে মানুষ মঙ্গলময় প্রগতি আকাঙ্ক্ষা করেন, বিশেষ করে রাজা, লোকনেতা, ধর্মনেতা, ব্রাহ্মণ এবং সন্ন্যাসী—তাঁদের পক্ষে, ঐ সমস্ত অধর্ম আচরণে লিপ্ত হওয়া কখনো উচিত নয়। 

 

তারপর মহারাজ পরীক্ষিৎ বৃষরূপ ধর্মের তপঃ, শৌচ এবং দয়ারূপ তিনটি ভগ্ন চরণ পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং তাঁর আশ্বাসপূর্ণ কার্যকলাপেরমাধ্যমে পৃথিবীর প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিলেন। 

 

মহা সৌভাগ্যশালী সম্রাট মহারাজ পরীক্ষিৎ বনগমনে অভিলাষী পিতামহ মহারাজ যুধিষ্ঠির কর্তৃক অর্পিত রাজোপযুক্ত সিংহাসনে সেই সময় উপবিষ্ট হলেন। 

 

এখন সেই রাজর্ষি, মহাভাগ, চক্রবর্তী, মহাযশা, পরীক্ষিৎ কৌরব রাজলক্ষ্মীর দ্বারা মহিমান্বিত হয়ে হস্তিনাপুরে অবস্থান করছেন। অভিমন্যু-পুত্র মহারাজ পরীক্ষিৎ এতই মহৎ গুণসম্পন্ন যে, তাঁর দ্বারা এই পৃথিবী শাসিত হয়েছে বলেই আপনাদের পক্ষে এই প্রকার যজ্ঞ করা সম্ভব হয়েছে।”

 


সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

মহাদেব তত্ত্ব

L


জড় জগতের তিনটি অবস্থা সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়। ব্রহ্মা হলেন সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু হলেন পালনকর্তা, আর শম্ভু বা দেবাদিদেব মহাদেব হলেন সংহার কর্তা। সমগ্র জড় জগৎ জড় প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সত্ত্ব গুণের অধীশ্বর হলেন বিষ্ণু। রজ গুণের অধীশ্বর হলেন ব্রহ্মা এবং তম গুণের অধীশ্বর হলেন শিব বা শম্ভু। 


‘শিব’ শব্দটির অর্থ  হলো ‘মঙ্গলময়’। তা সত্ত্বেও শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি ভগবান শিবের নির্মল স্বর্ণাভ দেহ ভষ্মের দ্বারা আচ্ছাদিত। তার জটাজুট শ্মশানের ধূলির প্রভাবে ধূম্র বর্ণ। তিনি সন্ধ্যাকালে ভূতগণ পরিবেষ্টিত হয়ে তাঁর তার বাহন বৃষভের পিঠে চড়ে ভ্রমণ করেন। অথচ ব্রহ্মার মতো মহাপুরুষেরা তাঁর শ্রীপাদপদ্মে নিবেদিত পুষ্প মস্তকে ধারণ করেন। 


এই প্রসঙ্গে আর একটি বিষয় উল্লেখ্য, যদিও প্রকৃত ভগবান ব্রজেন্দ্রনন্দন কৃষ্ণ তবুও বৈদিক সাহিত্যে শিব, ব্রহ্মা বা কোন অত্যন্ত মহান ভগবদ্ভক্তের সম্বোধনেও ‘ভগবান’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু স্বতন্ত্র পরমেশ্বর একমাত্র কৃষ্ণ। বাকি সবাই তাঁর ভৃত্য। 

আবার জন্মসূত্রে শিবের পিতা হলেন ব্রহ্মা। ব্রহ্মার অনুরোধ সত্ত্বেও তাঁর প্রথম মানস পুত্র চতুষ্কুমারগণ প্রজা সৃষ্টিতে লিপ্ত হতে অস্বীকার করলে ব্রহ্মার অন্তরে দুর্বিসহ ক্রোধ উৎপন্ন হয়েছিল। যা তিনি সংবরণ করার চেষ্টা করলেও তা তাঁর ভ্রূর মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল এবং নীললোহিত বর্ণের একটি শিশু উৎপন্ন হয়েছিল। জন্মের পরেই শিশু ক্রন্দন বা রোদন করতে শুরু করে। ব্রহ্মা তখন বলেছিলেন “হে সুরশ্রেষ্ট। যেহেতু তুমি উৎকন্ঠিত হয়ে রোদন বা ক্রন্দন করেছ তাই প্রজাসমূহ তোমাকে ‘রুদ্র’ নামে অভিহিত করবে।” এ প্রসঙ্গে অনেকে প্রশ্ন করেন শিব ব্রহ্মার চাইতেও শ্রেষ্ঠ হলে ব্রহ্মা কিভাবে শিবের পিতা হলেন? এখানে আমাদের বুঝতে হবে ব্রহ্মা হচ্ছেন জীবতত্ত্ব কিন্তু শিব হচ্ছেন শম্ভুতত্ত্ব। ভগবান যে রকমই বিষ্ণুতত্ত্ব হয়েও আত্মামায়ার প্রভাবে জন্মগ্রহণ করেন সেইভাবে শিবও ব্রহ্মার থেকে আবির্ভূত হলেও তত্ত্বত শম্ভু তত্ত্ব। 

শিবতত্ত্ব


শিব জীবতত্ত্ব নন। শিব বিষ্ণুতত্ত্বও নন। শিব হচ্ছেন বিষ্ণুতত্ত্ব ও জীবতত্ত্বের মধ্যবর্তী শিবতত্ত্ব বা শম্ভুতত্ত্ব। বিষ্ণু তত্ত্বের মধ্যে ৬০টি দিব্যগুণ প্রকাশিত হয়। শুদ্ধ জীবাত্মার মধ্যে সর্বাধিক ৫০টি দিব্যগুণ প্রকাশিত হয় আর শিবতত্ত্ব বা শম্ভুতত্ত্বের মধ্যে ৫৫টি দিব্যগুণ প্রকাশিত হয়।


 এই জড়জগত ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি সম্ভুত। বহিরঙ্গা শক্তি জড় হওয়ায় স্বতন্ত্র রূপে কিছু সৃষ্টি করতে সমর্থ নয়। ঠিক যেমন মাতা, পিতাপর সহায়তা বিনা সন্তান উৎপাদন করতে পারেন না।  ভগবান তাঁর দৃষ্টির মাধ্যমে চিদ-জগৎ থেকে ভগবৎবিমূখ জীবাত্মাদের জড় জগতে প্রেরণ করলে, জড় জগতে সৃষ্টির সূচনা হয়।



এই জড় সৃষ্টির প্রথম জীব ব্রহ্মা। এই দৃষ্টি বা ঈক্ষণ সম্বন্ধে ঐতরেয় উপনিষদে বলা হয়েছে- “স ঐক্ষত” (ঐতরেয় উ.১/১/১) “স ইমাল্লোঁকান অসৃজত” (ঐতরেয় উ.১/১/২)। ভগবানের এই দৃষ্টিকেই বলা হয় শম্ভু। ভগবান সরাসরি তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির সঙ্গে সঙ্গ করেন না-এই জন্যই একে ‘বহিরঙ্গা’ বলা হয়। তাই ভগবান শিব বা শম্ভু রূপে বহিরঙ্গা প্রকৃতির সঙ্গ করেন। বহিরঙ্গা শক্তি হলেন দুর্গা দেবী। এই জন্য জড় জগতে বিচারে শিব ও দুর্গা হলেন টিতা ও মাতা।


এ প্রসঙ্গে ব্রহ্মসংহিতা (৫/৯) বলা হয়েছে-“লিঙ্গযোন্যাত্মিকা মাতা ইমা মাহেশ্বরী প্রজাঃ” অর্থাৎ “এই জগতের সমস্ত মাহেশ্বরী (মহেশ্বর থেকে আগত) প্রজাই লিঙ্গযোনি স্বরূপ।” সেই কারণেই শিবলিঙ্গ রূপে শিবপূজার প্রচলন আমরা দেখতে পাই। 


এখন ভগবান, শিব রূপে জীবসমূহকে জড়া প্রকৃতিতে প্রেরণ করলেও শিব পরমেশ্বর ভগবান নন। এই প্রসঙ্গে ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৪৫) এ খুব সুন্দর একটি উপমা দেওয়া হয়েছে- 


ক্ষীরং যথা দধিবিকারবিশেষযোগাৎ

সঞ্জায়তে ন হি তত পৃথগন্তি হেতোঃ।

যঃ শম্ভুতামপি তথা সমুপৈতি কার্যাদ্

গোবিন্দমাদিপুরুষম্ তমহং ভজামি।।


 অর্থাৎ, ঠিক যেমন অম্লের প্রভাবে দুধ দই-এ পরিণত হয় কিন্তু দই নয়, সেই রকমই আমি সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে প্রণাম করি যাঁর বিশেষ কার্যের জন্য পরিবর্তিত তত্ত্ব হলেন শম্ভু, কিন্তু শম্ভু ভগবান নয়। আমরা বাস্তব অভিঙ্গতা থেকেও দেখতে পাই দুধকে সহজেই দইতে পরিণত করা যায়অ কিন্তু দইকে কখনই দুধে পরিণত করা যায় না। সেই রকমই ভগবান শম্ভুর উৎস কিন্তু শম্ভু কখনও ভগবান হতে পারেন না। ভগবৎ তত্ত্ব বা বিষ্ণুতত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে জড় গুণের অতীত কিন্তু শিব কখনও জড় গুণের দ্বারা প্রভাবিত হন। 


এই প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শ্রীমদ্ভাগবত (৪/৩/১৫) এর তাৎপর্যে শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের উদ্ধৃতি দিয়েছেন- “শ্রীশিব হচ্ছেন আত্মারাম বা পূর্ণাত্মা উপলব্দির স্তরে অবস্থিত। কিন্তু যেহেতু তিনি তম গুণের দায়িত্বভার সমন্বিত ভগবানের গুণাবতার, তাই তিনি কখনও কখনও জড় জগতে সুখ দুঃখের দ্বারা প্রভাবিত হন।”


চিদ্ জগতে শিব সদাশিব রূপে অবস্থান করেন। কখনও কখনও শিবকে বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষকও বলা হয়। শিবের নিত্যধাম-মহেশধাম জড়জগৎ ও বৈকুণ্ঠ ধামের মধ্যবর্তী। এ প্রসঙ্গে ব্রহ্মসংহিতা (৫/৪৩)- এ বলা হয়েছে, “গোলোকনাম্নি নিজ ধান্মি তলে চ  তস্য দেবী-মহেশ-হরি ধামসু তেষু তেষু” এখানে দেবীধাম অর্থে জড় জগৎ এবং হরিনাম অর্থে বৈকুন্ঠ লোব এবং মেহশ ধাম তার মধ্যবর্তী। সেই সদাশিবই জড় জগতে রুদ্র রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন।


শিব পরম বৈষ্ণব

শিব ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত ‘শ্রীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধে শিব নিজেই বলেছেন, “আমি সর্বদা ভগবান বাসুদেবকে আমার প্রণতি নিবেদন করি। কৃষ্ণচেতনাই হচ্ছে শুদ্ধ-চেতনা। যাতে বাসুদেব নামে অভিহিত পরমেশ্বর ভগবান আবরণ শুণ্য হয়ে প্রকাশিত হন” শ্রীমদ্ভাগবতের পঞ্চম স্কন্ধের বর্ণনা থেকে জানা য়ায় যে, জম্বুদ্বীপের অন্তর্গত ইলাবৃত বর্ষের একমাত্র পুরুষ হচ্ছেন ভগবান শিব। সেখানে তিনি দেবী দুর্গা ও তাঁর অসংখ্য অনুচরীদের সঙ্গে বাস করেন। তা সত্ত্বেও শিব সর্বদা চর্তুর্ব্যূহের অন্যতম ভগবান সঙ্কর্ষণের ধ্যানে মগ্ন। যিনি শিবের প্রকৃত উৎস।

ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধে আমরা আরও দেখতে পাই শিবের দ্বারা গীত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা যা ‘রুদ্রগীত’ নামে খ্যাত। রাজা প্রাচীন বহির্ষতের পুত্র প্রচেতাদের শিব দর্শন দিয়ে বলেছিলেন, “হে মহারাজ প্রাচীনবর্হির পুত্রগণ! তোমাদের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হোক। আমি জানি তোমরা কি করতে চাও, তাই তোমাদের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করবার জন্য আমি তোমাদের গোচরীভূত হয়েছি। যে ব্যক্তি জড়া প্রকৃতি ও জীব আদি সবকিছুর পরম নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয়।” এ কথা বলে শিব প্রচেতাদের কাছে শ্রীভগবানের গুণকীর্তন রুদ্রগীত প্রকাশ করেছিলেন।


ভক্তিতে যে চারটি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে, তার একটি এসেছে মহাদেবের থেকে। তাঁর সম্প্রদায় রুদ্র সম্প্রদায় নামে বিখ্যাত। শিব সাধারণত ভূত প্রেত পরিবৃত হয়ে বাস করেন।  এটি প্রকৃতপক্ষে তাঁর বিশেষ করুণার প্রকাশ। ভূত-প্রেত-পিশাচ প্রভৃতি পাপযোনিতে আবদ্ধ জীবরাশি শিবের মাধ্যমে ভক্তসঙ্গ লাভ করে এবং ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়। বলা হয় কখনও কখনও শিব ব্রহ্মজ্যোতিতে বিচরণকারী জীবাত্মারাও বিমল কৃষ্ণভক্তির সুযোগ লাভ করে। শ্রীমদ্ভাগবতে (১২/১৩/১৬) সূত গোস্বামী বলেছেনঃ

“নিম্নগানাং যথা গঙ্গা দেবানামচ্যুতো যথা

বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভুঃ পুরাণানামিদং তথা।” 

অর্থাৎ ঠিক যেমন সমস্ত নদীর মধ্যে গঙ্গা শ্রেষ্ঠ, সমস্ত আরাধ্য বিগ্রহদের মধ্যে অচ্যুতই পরম, বৈষ্ণবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তেমনি শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে পুরাণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। 


অসুরেরা সাধারণতঃ শিবভক্ত

সাধারণতঃ দেখা যায় জগৎপালক বিষ্ণু সকল ঐশ্বর্যের অধিকারী। অথচ দেবাদিদেব শিব দারিদ্রের মধ্যে বাস করেন। অন্যদিকে বিষ্ণুভক্তগণ সাধারণত দারিদ্রক্লিষ্ট হয়ে থাকেন। আর শিবভক্তগণ প্রচুর সম্পদ লাভ করেন। এই বিষয়টি পরীক্ষিৎ মহারাজ শুকদেব গোস্বামীকে ব্যাখ্যা করতে অনুরোধ করেছিলেন। উত্তরে শুকদেব গোস্বামী বলেন, প্রকৃতির তিনটি গুণ অনুসারে দেবাদিদেব শিব ত্রিবিধ অহঙ্কার রূপে প্রকাশিত। এই অহঙ্কার থেকে পঞ্চভূত ও জড়া প্রকৃতির অন্যান্য বিকারগুলি উৎপন্ন হয়ে মোট ষোলটি বিকার পদার্থ উৎপন্ন হয়েছে। 



যখন শিবভক্ত এই সমস্ত পদার্থের মধ্যে তাঁর অভিপ্রকাশের অর্চনা করেন, তখন সেই ভক্ত তদনুরূপ উপভোগ্য সকল প্রকারের ঐশর্য লাভ করেন। কিন্তু যেহেতু ভগবান শ্রীহরি জড়া প্রকৃতির গুণাবলীর অতীত, তাই তাঁর ভক্তবৃন্দও অপ্রাকৃত গুণসম্পন্ন হয়ে ওঠেন। ভগবান হরি তাঁর অনুগৃহীত ভক্তদের জড় সম্পদ হরণ করে তাঁদের আরও দৃঢ়ভাবে হরি, গুরু ও বৈষ্ণবদের শরণ নিতে উৎসাহিত করেন। শিবভক্তরা সাধারণত আসুরিক প্রবৃত্তি সম্পন্ন হয়ে থাকে কারণ তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য জড় জাগতিক ভোগ সামগ্রী লাভ করা। এইভাবে আমরা দেখতে পাই রাবণ, বাণাসুর, কুম্ভকর্ণ প্রমুখ অসুরেরা শিবের বরেই প্রভূত জড়জাগতিক ক্ষমতা লাভ করে ভগবানের বিরোধিতা করেছিল।


শিব সাধারণতঃ খুব তাড়াতাড়ি তাঁর ভক্তদের প্রতি সন্তুষ্ট হন। এই জন্য তাঁকে ‘আশুতোষ’ বলা হয়। আর দ্রুত জড়জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্য লাভের জন্য, ভোগবৃত্তি সম্পন্ন ব্যক্তিরা শিবের শরণাগত হয়।



প্রয়শই দেখা যায়, তথাকথিত শিবভক্তরা ভাঙ, গাঁজা ইত্যাদি নেশার প্রতি আসক্ত। তারা দবী করে এগুলি শিবের প্রসাদ। কিন্তু পরম বৈষ্ণব শিব কখনই এগুলি গ্রহণ করেন না। পার্বতী শিবের স্ত্রী, গণেশ শিবের পুত্র। কিন্তু আমরা কখনই পার্বতী বা গণেশকে গাঁজা বা ভাঙ গ্রহণ করতে দেখি না। পক্ষান্তরে পার্বতী ও গণেশ, শিবের মতোই মহান ভগবদ্ভক্ত। তাই তথাকথিত শিবের ভক্তরা না শিবের ভক্ত না ভগবদদ্ভক্ত। প্রকৃতপক্ষে তারা জড়সুখের ভক্ত।


এখঅন থেকে আমাদের শিক্ষণীয় যে, আমাদের জড় সুখ ভোগের জন্য বিভিন্ন দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করা উচিত নয়। আমাদের কেবল পরমেশ্বর ভগবানের প্রীতির উদ্দেশ্য তাঁর উপাসনা করা উচিত। এই প্রসঙ্গে গীতায় (৭/২২-২৩) ভগবান বলেছেন-“সেই ব্যক্তি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সেই দেবতাদের আরাধনা করেন এবং সেই দেবতাদের কাছ থেকে আমারই দ্বারা বিহিত কাম্য বস্তু লাভ করে। অল্পবুদ্ধি ব্যক্তিদের আরাধনালব্দ সেই ফল অস্থায়ী। দেবোপাসকগণ দেবলোক প্রাপ্ত হন, কিন্তু আমার ভক্তরা আমার পরমধাম প্রাপ্ত হন’।


শিবের ‘হলাহল বিষ’ কন্ঠে ধারণ

শিবের অপর নাম নীলকন্ঠ। সমুদ্র মন্থনে উত্থিত হলাহলের প্রভাব যখন সমগ্র সৃষ্টিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন দেবতাগণ শিবের শরণ গ্রহণ করেছিলেন। দেবতাদের বিনীত প্রার্থনায় খুশি হয়ে করুণাবশতঃ শিব দেবতাদের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর নিত্যশক্তি ভবানীর প্রতি আলোচনার সুরে বলেছিলেন, “হে সাধ্বী ভবানী, কেউ যখন পরোপকার করে, তখন ভগবান শ্রীহরি অত্যন্ত প্রসন্ন হন, তখন আমিও অন্যান্য প্রণীসহ প্রসন্ন হই। তাই আমি এই বিষ পান করব। আমার দ্বারা সকলের মঙ্গল সাধন হোক।” 


এই কথা বলে শিব সেই বিষ করতলে গ্রহণ করে পান করেছিলেন। ক্ষীর সমুদ্র থেকে উৎপন্ন সেই বিষ মহাদেবের কন্ঠে একটি নীল রেখা উৎপন্ন করেছিল। সেই রেখাটিকে মহাদেবের ভূষণ বলে মনে করা হয়। শিবের হলাহল পানের এই দৃষ্টান্ত থেকে আমরা বেশ কয়েকটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।  


প্রথমত, দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, সমস্ত কর্মের মাধ্যমে ভগবানকে প্রসন্ন করা এবং দুই, আমাদের প্রাণ, অর্থ, বুদ্ধি, বাকশক্তি প্রভৃতির সাহায্যে সর্বদা পরোপকারের চেষ্টা করা এবং দুই, আমাদের প্রাণ, অর্থ, বুদ্ধি, বাকশক্তি প্রভৃতির সাহায্যে সর্বদা পরোপকারের চেষ্টা করা। এখন মায়ামুগ্ধ জীবেদের ভগবদ্ভক্তি প্রদানের মাধ্যমে দুটি উদ্দেশ্যই সর্বোত্তম রূপে সাধিত হয়। এই কারণেই জ্ঞান ভক্তদের নিকট প্রচার করেন তাদের মতো প্রিয় ভগবানের আর কেউ নেই আর ভবিষ্যতেও কেউ হবেন না।  


দ্বিতীয়ত, হলাহল পান করার পূর্বে শিব তাঁর স্ত্রী ভবানীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। এখান থেকে শিক্ষনীয় যে, আদর্শ গৃহস্থের কর্তব্য কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পত্নীর সঙ্গে আলোচনা করা। এই কারণে পত্মীকে বলা হয় অর্ধাঙ্গিনী।

সাধারণতঃ ভক্তসঙ্গের মধ্যে বৈষ্ণব-নিন্দাকে হলাহলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রকৃত ভক্তদের কর্তব্য কখনও বৈষ্ণব-নিন্দা দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া এবং একই সঙ্গে অন্য করোর কাছে সেই নিন্দা-বাক্য প্রকাশ না করা। তবে শুধুমাত্র পরিস্থিতির উন্নতির জন্য বা সংশ্লিষ্ট ভক্তের আধ্যাত্মিক প্রগতির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে তা প্রকাশ করা যেতে পারে। 



মোহিনী মূর্তির শিব বিমোহন 

সমুদ্র মন্থনের সময় ভগবানের মোহিনীমূর্তি অবতারের বিষয়ে শ্রবণ করে শিব ভগবানের সেই রূপ দর্শন করবার ইচ্ছা করেছিলেন। স্বীয় শক্তি পার্বতী এবং ভূত-প্রেতদের সঙ্গে পরমেশ্বর ভগবানের কাছে এসে তিনি সেই ইচ্ছা নিবেদন করেছিলেন। শিবের অনুরোধে সম্মত হয়ে ভগবান তাঁর মোহিনীরূপ প্রকট করেছিলেন। মোহিনী মূর্তিকে দর্শন করে মহাদেবের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিল এবং কামান্ধ হস্ত্রী যেভাবে হস্তিনীর প্রতি ধাবিত হয়, মহাদেবও সেইভাবে সেই সুন্দরীর প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। মহাদেবের বীর্য সম্পূর্ণরূপে স্খলিত হলে, তিনি বুঝেছিলেন কিভাবে তিনি ভগবানের মায়ায় বশীভূত হয়েছেন। তখন তিনি সেই মোহ থেকে নিবৃত্ত হয়েছিলেন। 



এইভাবে শিব নিজের এবং অনন্ত শক্তিমান ভগবানের স্থিতি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর মোহিনী শক্তি যে তাঁকে এইভাবে মোহিত করেছিল তাতে তিনি একটুও বিচলিত বা লজ্জিত হননি, যা দেখে ভগবান মধুসূদন অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। 


এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর তাৎপর্যে লিখেছেন যে, শিব ভগবানের কাছে এইভাবে পরাজিত হয়ে গর্বিতই হয়েছিলেন। কারণ শিব যদিও পরাজিত হয়েছিলেন কিন্তু তিনি পরাজিত হয়েছিলেন তাঁর নিজেরই প্রভু অনন্ত শক্তিসম্পন্ন পরমেশ্বর ভগবানের কাছে। এইভাবে আমরা দেখতে পাই, প্রকৃত ভগবদ্ভক্তের সন্তোষ তাঁর প্রভু পরমেশ্বর ভগবানের গুণকীর্তনে, তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের কারণে নয়।  


আমরা দেখতে পাই, শিব ও বিষ্ণুকে নিয়ে সাধারণতঃ জনমানসে বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকে মনে করেন শিব পরমেশ্বর ভগবান এবং অনেকে মনে করেন বিষ্ণু পরেমশ্বর ভগবান। কিন্তু আমরা যখন শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতি সমস্ত শাস্ত্রের আধারে বিচার করি তখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিষ্ণুই পরমেশ্বর ভগবান। 


শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত শিব কর্তৃক বৃকাসুরকে বর প্রদান করার কাহিনী, বানাসুরকে রক্ষা করার জন্য শিব ও কৃষ্ণের যুদ্ধের কাহিনী প্রভৃতি আরও অনেক উপাখ্যান থেকে এটি সন্দেহাতীত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিষ্ণুই পরমেশ্বর ভগবান, পক্ষান্তরে সমগ্র পুরাণ ও ইতিহাসে, এমনকি শিব পুরাণেও, এমন একটিও উদাহরণ নেই যেখানে বিষ্ণু শিবের দ্বারা পরাজিত হয়েছেন। 


তাই পদ্মপুরাণে শিব নিজেই পার্বতীকে বলেছেন- 

 

আরাধনানাং সর্বেষাং বিষ্ণোরারাধনাং পরম 

তস্মাৎ পরতরং দেবি তদীয়ানাং সমর্চনম্ঃ। 

 

অর্থাৎ সমস্ত রকমের উপাসনার মধ্যে বিষ্ণুর উপাসনা শ্রেষ্ঠ এবং তাঁর চেয়েও শ্রেষ্ঠ বিষ্ণুভক্তদের উপাসনা করা। এই জন্য আমাদের কর্তব্য স্বতন্ত্র ঈশ্বররূপে শিবপূজা না করে, ভগবানের ভক্ত রূপে, বৈষ্ণব রূপে শিবের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা।

আমাদের জীবনে গীতা

  গীতা জ্ঞান সম্পর্কে অনাদি কাল থেকে বহু ভাষ্য ও উপাখ্যান লেখা হয়ে চলেছে; আজ ওই কাজে অনেক সাধক, অধ্যাপক ও অভ্যাসই লেগে আছেন।  যতই লেখা হোক ন...