(১) গীতাজ্ঞানের বিশেষত্ব
বিশ্ব সাহিত্যে গীতা একটি বিশেষ স্থান পেয়েছে | ব্যাস কৃত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা মহাভারতে ভীষ্ম পর্বের অন্তর্গত | এই গ্রন্থে আঠারটি অধ্যায় এবং তীনশো শ্লোক ব্যাবহার করে সংবাদের মাধ্যামে শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনের মনে উত্পন্ন বিভিন্ন শঙ্কা নিরসন কারেছেন এবং তাকে যুদ্ধ করার জন্য সত্সাহস যুগিয়েছেন | ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরার ইতিহাসে গীতা, উপনিষদ আর ব্রাহ্মসুত্র কে প্রস্থান ত্রয়ী বলা হয়, যার আমাদের জ্ঞান চর্চার পরম্পরায় এক বিশেষ ভূমিকা আছে | তাই গীতা জ্ঞান এর কিছু বিশেষত্বের কথা দিয়েই আমরা আমাদের অধ্যয়ন আরম্ভ করছি |
প্রথমত গীতা কোনো কাল খন্ডের, কোনো ব্যাক্তি বিশেষের বা কোনো জাতি বিশেষের গ্রন্থ নয় | এর শিক্ষা সর্বকালে সমস্ত মানুষের জন্য প্রযোজ্য | মানব জাতি কে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গীতা একটি সনাতন দীপস্তম্ভের কাজ করে | ছল চাতুরি এবং সামাজিক বিপর্যয় তা ব্যাক্তিগত বা জাগতিক যাই হোক না কেন গীতা প্রতিবারই পথ প্রদর্শক হয়েছে | এর জ্ঞান এর ব্যবহার প্রতিবারই সমাজ চেতনায় নব জাগরণ আনার জন্য হয়ে আসছে |
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের গ্রন্থ হবার কারণে এই গ্রন্থে দৈনন্দিন জীবনের শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও প্রজ্ঞা জাগরিত করার জন্য সহায়ক মন্ত্র বিদ্যমান | এতে জীবনের গান আছে, মৃত্যুর রোদন নেই | কেবল সমস্যার কথা বলেই গীতা ক্ষান্ত না হয়ে তার প্রতিকারের জীবন মুখী সমাধান দেয় | এই জন্য গীতা কেবল জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারিত করতেই সহায়ক্ নয়, তা চরিতার্থ কারার উপায় ও খুঁজে পেতে সাহায্য করে | স্বভাব, স্বকর্ম আর স্বাধর্মের কথা বলে গীতা মানব জীবনে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে | প্রকৃত পক্ষে জ্ঞান গঙ্গা কে পর্বত শিখর থেকে বাস্তাবের ধরাতালে আনার কাজ গীতা করেছে | তাই গীতা এই মর্মে দ্বিতীয় ভগিরথের প্রতীক | সেই কারণে এই জ্ঞান গঙ্গা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের পরিপন্থী না থেকে সমস্ত মানব সমাজ কেই জ্ঞানে পূর্ণ করে এসেছে |
তৃতীয়ত, গীতা নিজেই একটি পূর্ণ গ্রন্থ | এর জন্য অন্য কোনো সহায়ক গ্রন্থের, অন্য কোনো মধ্য ব্যক্তির বা পণ্ডিতের মধ্য ভূমিকার প্রয়োজন নেই | মানুষকে বুদ্ধি যুক্ত কর্মের স্বাধীনতা এই গীতা দিয়ে থাকে | স্বচ্ছন্দ ভাব না দিয়ে ব্যাক্তি কে অনুশাসনের সহিত আরাধনার প্রেরণা দেয় | মানুষের বুদ্ধি এবং বিশ্বাসের মধ্যে সমন্বয় স্থাপনের মাধ্যামে গীতা মানুষের জীবন দৃষ্টি বিকসিত করে |
চতুর্থত , গীতা সমুদ্রের মতো গভীর | এতে অল্প ডূব দিলেই কী আর গভীরতায় গেলেই কী, কেও খালি হাথে ফেরে না | প্রত্যেকেই জ্ঞান মোতি পায় | গীতা কে এমন এক পর্বতের সাথে তুলনা করা যেতে পারে যার প্রতিটি অংশে জ্ঞান জ্যোতি বিদ্য়মান | যে যেমন আরোহণ করবে তার তেমনি আহরণ হবে | যার যেমন প্রচেষ্টা তার জন্য তেমনি প্রসাদ | তাই বলা যায় এই পথে সব প্রচেষ্টাই সাফল্যের পরিপন্থী হবে | এটি মানবজাতির প্রতি এক মহান অনুগ্রহ স্বরূপ | মহাভারত ভারতীয় মনীষার নাগধিরাজ হলে গীতা হল তার শৃঙ্গ কৈলাশ | তাই প্রতি যুগে গীতার উপস্থিতি অনুরণিত হবে এটাই স্বাভাবিক | তাই আমরা বলতে পারি যে গীতা হল ভারতীয় প্রজ্ঞার এক অদ্ভুত এবং অনবদ্য কৃতি |
(২) গীতা শব্দজ্ঞান
এই শব্দ চয়নিকা তে ওই শব্দ গুলিকেই সমাবিষ্ট করা হল যাদের জ্ঞান গীতা অধ্যয়নের জন্য অতি আবশ্যক মনে করা হয় | সহজ এবং বোধগম্য করার জন্য শব্দ গুলি কে সাধারণ ভাষায় প্রস্তুত করা হল |
আত্মা : প্রত্যেক দেহাধারীর মধ্যে বিদ্যমান এক সূক্ষ্ম তত্ব যা সনাতন পরমাত্মার অংশ এবং যার বিনাশ নেই | এটি জীবের সমস্ত অঙ্গে ব্যাপ্ত |
স্বধর্ম : স্বধর্মের সরাসরি অর্থ হল নিজ ধর্ম | অর্থাত্ কোনো সামাজিক ব্যবস্থায় ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত কিছু নিত্য কর্ম আর কিছু অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য |
.
সাংখ্য : এক অর্থে সাংখ্য হল সেই জ্ঞান মার্গ যার মারফত ব্যক্তি আত্মা - পারামাত্মার সম্মিলন বুঝে নিয়ে মুক্তির পথ গামী হয় | অন্য ভাবে কাপিলমুনীর সাংখ্য শাস্ত্র অনুসারে প্রকৃতি অকর্তা পুরুষের চেতন তত্বের সংস্পর্শে এসে অভিব্যক্ত হয় | গীতা তেও পরা আর অপরা , অর্থাত্ প্রকৃতি ও পুরুষের , সংযোগে অভিব্যক্ত সত্তার কথা স্বীকার করে | বৈদিক মতে এটাও স্বীকার করা হয় যে এই দুই প্রকৃতি ঈশ্বরের ভিন্ন বহিপ্রকাশ আর ব্রহ্ম থেকেই ব্যাপ্ত |
যোগ: আক্ষরিক অর্থে যুক্ত হওয়া কেই যোগ বলা হয় | ভারতীয় শডদর্শনের অন্যতম হল যোগ, আর এর প্রমুখ গ্রন্থটি মহর্ষি পাতন্জলি বিরচিত যোগ সূত্র | এর মূল কথা হল আত্মার শক্তির বহিপ্রকাশের জন্য চিত্ত বৃত্তির নিয়ন্ত্রণ, পরিশোধন আর নিয়মের পালন খূব জরুরী | জীবন সিদ্ধান্ত কে বাস্তব জীনবে অনুভব করার কলা কৌশল্যই হল যোগ | জ্ঞান যোগ, ভক্তি যোগ আর ধ্যান যোগের মহিমা স্বীকার করা সত্বেও যোগ দর্শনে ব্যক্তি জীবনে কর্ম যোগের প্রাধান্য স্বীকার করে | গীতা যোগ দর্শন কে সমত্ব বুদ্ধি আর কার্য কুশলতার সাথে যুক্ত করে ব্যাক্তি কে নিষ্কাম কর্ম যোগের পথে চলার প্রেরণা দেয় |
কর্ম যোগ : ( কর্ম, অকর্ম ও বিকর্ম ): কর্ম একটি বৈদিক শব্দ | পূর্ব মীমাংসা অনুসারে পরামাত্মার মধ্যে সগুন- সঙ্কল্প আসার পর যে ক্রিয়াশীলতা আসে তাকেই কর্ম বলা হবে | সাধারণ অর্থে কামনা পূর্তির জন্য যা করা হয় তাকেই কর্ম বলে | কর্মের আরও অনেক ভেদ করা হয়েছে | দৈনিক কার্য কে নিত্য কর্ম আর বিশেষ উদ্দেশ্যে করা কাজ কে নৈমিত্তিক কর্ম বলা হয়েছে | পরমার্থের জন্য করা কাজ কে যজ্ঞার্থ কর্ম আর কামনা পূর্তির জন্য করা কাজ কে পুরুষার্থ কর্ম বলা হবে | এই মান্যতা সমাজে ছিল যে যজ্ঞার্থ কর্ম থেকে কোনো কর্ম বাঁধন উত্পন্ন হয় না আর ব্যক্তি জন্ম মৃত্যুর বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে | উপনিষদ থেকে ব্যাপ্ত কর্ম সন্যাস অর্থাত্ সর্ব কর্ম পরিত্যাগের সিদ্ধান্তও সমাজে প্রচলিত ছিল |
গীতা কর্ম যোগের সিদ্ধান্ত কেই সর্বাগ্রে প্রতিপাদিত করে | সহজ অর্থে বলতে গেলে ফলের আশা ত্যাগ করে আর কর্তা ভাব ছেড়ে দিয়ে স্বধর্ম পালনের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাওয়া | সাত্বিক ও নিষ্কাম কর্ম কেই গীতা স্বধর্ম মানে | অকর্মের সাধারণ অর্থ নিষ্ক্রিয়তা বা ক্রিয়াহীনতা ও বোঝায় | যে কাজে কর্তা ভাব বা আহমিকা না থাকে তাকে গীতা অকর্ম মানে | এই ভাবে নিষ্কাম কর্মই অকর্ম | বিকর্ম অর্থে নিষিদ্ধ কর্ম বোঝায়, কিন্তু বিনোবা ভাবে একে বিশেষ কর্ম মানেন |
অষ্টধা প্রকৃতি : সাংখ্য প্রকৃতির ধারণা কেই গীতায় অপরা প্রকৃতি বলা হয়েছে | একে ক্ষেত্র ও ক্ষর পুরুষ ও বলা হয়েছে | এই নাশবান প্রকৃতি কেই গীতা র সপ্তম অধ্যায়ে অষ্টধা প্রকৃতি বলা হয়েছে | পৃথিবী, জল, আকাশ, বায়ু, অগ্নি এই পাঁচ মহাভুতের সাথে মন , বুদ্ধি ও অহংকার কে এর আট অংশ বলা হয়েছে |
পরা প্রকৃতি: জীব রূপে প্রকৃতি কে গীতা পরা প্রকৃতি মানে | এটাই সাংখ্য মতে পুরুষ | গীতা তে একেই জীবাত্মা বা অক্ষর পুরুষ বলা হয়েছে | পরা আর অপরা দুই প্রকৃতিকে পারামাত্মার অংশ হিসেবে গীতা তে দেখা হয় |
মায়া (যোগ মায়া ) : ভারতীয় যোগ দর্শনের একটি তর্ক সঙ্গত পক্ষ হল মায়া | ত্রিগুনি প্রকৃতি কে পরমাত্মার মায়া বলা হয়েছে | সব সময় পরমাত্মার মধ্যে জ্ঞান শক্তি ও সর্গ শক্তি বিদ্যমান | জ্ঞান শক্তির (স্বরূপ শক্তি )দ্বারা পরমাত্মার স্বরূপ জানা যায় | সর্গ শক্তির দ্বারা পরমাত্মা ভূত মাত্রের উত্পত্তি করে থাকেন | এই প্রক্রিয়ায় . ত্রিগূনি প্রকৃতি মহত ব্রাহ্ম যোনীর কাজ করে | প্রকৃত পক্ষে মোহ আর অজ্ঞানের অবস্থা কেই মায়া মনে কারা হয় | আবরণ শক্তি আর বিক্ষেপ শক্তি হল মায়ার দুই শক্তি | আবরণ শক্তির দ্বারা মায়া কোনো বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ কে ঢেকে দেয় আর বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা মায়া মিথ্যা জ্ঞান উত্পন্ন কারে | মায়া আর অবিদ্যার কারণেই মানুষ ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারে না, আত্মার শুদ্ধ - বুদ্ধ স্বরূপ ও বুঝতে পারে না | আসলে সমগ্র জগতই পরমার্থের দৃষ্টি তে সত্তাহীন আর ঈশ্বরের মায়া মাত্র | প্রকৃত পক্ষে ব্রাহ্ম ই সর্ব সত্তাবান |
অক্ষর ব্রহ্ম : সৃষ্টির সেই অনাদি, অনন্ত, অবিনাশী , অব্যয় তত্ব যা সৃষ্টির মূল কারণ স্বরূপ তাকেই অক্ষর ব্রাহ্ম বলা হবে | অব্যক্ত , নির্গুন , নিরাকার সেই ব্রহ্ম অতি সূক্ষ্ম স্বরূপে থাকে | বৃহদআরন্যক উপনিষদে গার্গির এক প্রশ্নের উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি বলেছিলেন : "হে গার্গি, সেটাই অক্ষর ব্রহ্ম যাকে কেও দেখেনি কিন্তু সে সবাইকে দেখছে, যাকে কেও শোনে নি কিন্তু সে সবাই কে শুনছে, আবার যাকে কেও ভাবে নি কিন্তু সে সবার কথা ভাবছে | যাকে কেও জানতে পারেনি, কিন্তু সে সবাইকে জানতে পেরেছে | তাকে ভিন্ন কেও দেখবার , যানবার বা বুঝবার নেই | "
ভক্তি : মানুষের মোক্ষ প্রাপ্তির পথে জ্ঞান আর কর্মের সাথে ভক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য | ঈশ্বরের প্রতি ভাব বিহ্বলতা কেই সাধারণ অর্থে ভক্তি বোঝায় | কিন্তু গীতা তে ঈশ্বরের সগুন আর নির্গুন এই দুই উপাসনার কথাই বলা হয়েছে | গীতা য় বর্ণিত ভক্ত স্বধর্ম পালনের সাথে সাথে কর্ম দক্ষ, আত্ম নিষ্ঠ , ক্ষমাশীল ও সমত্ব বোধ যুক্ত হয় | গীতা র ভক্তি তে জ্ঞান আর কর্ম ও সমাবিষ্ট | এটি গীতা র ভক্তির নিজস্ব বিশেষত্ব |
প্রকৃতি : সাংখ্য মতে সংসারের মূল উদ্গম স্থল ই প্রকৃতি | মূলত প্রকৃতি এক অদৃশ্য, অব্যক্ত , নিশ্চল ও জড়ো তত্ব হিসেবে অবস্থান কারছে | সত্ব, তম আর রজ গুণের সমাবেশে প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মক | পুরুষের সহিত যুক্ত হলেই এর সাম্যাবস্থা বিঘ্নিত হয় আর তিন গুণের আধারে সৃষ্টির রচনা হয় |
পুরুষ : সাংখ্য মতে পুরুষ সেই রূপ যা প্রকৃতির সহিত মিলিত হয়ে সৃষ্টির রচনা করে | পুরুষ ও প্রকৃতি স্বতন্ত্র আর স্বায়ত্ত | আবার পুরুষ নানা প্রকারেরও হয় | গীতা এই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে | গীতা সাংখ্য মতে পুরুষ জিবাত্মা, পরা প্রকৃতি, ক্ষেত্রজ্ঞ ও অক্ষর পুরুষ হিসেবে ব্যাপ্ত | নির্লিপ্ত থেকে ও পরমাত্মার অংশ হিসেবেই পুরুষ বিদ্য়মান | পুরুষ অতীন্দ্রিয় কিন্তু চেতন, দেহ ধারী হবার কারণে সংসারের সুখ - দুঃখ আদি ভোগ করে , জিবাত্মার শুদ্ধ - বুদ্ধ স্বরূপ বিঘ্নিত হয় , তার উপর অবিদ্যা রূপী ধূলার আস্তরণ জমে যায় | সে ত্রিগুণাত্মক পদার্থ ভোগ করতে করতে ভালো অথবা মন্দ যোনীর মাধ্যামে ব্যাপ্ত হতে হতে সংসারের আসা - যাওয়ার চক্রে আটকে থাকে | যখন পুরুষ প্রকৃতি থেকে ভিন্ন অংশ হিদেবে নিজেকে বুঝে নিতে শিখে যায় তখনি তার মুক্তি | তখন সে অজ্ঞান, অবিদ্যা আর মোহ থেকে বিরত হয়ে সংসারের চক্র থেকে নিজেকে মুক্ত করে |
ত্রিগুণ: সাংখ্য মতে ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি হল সৃষ্টির কারণ | এই তিন গুণ হল - সত্ব, রজ আর তমো গুণ | প্রকৃতি তে এই তিন গুণ সাম্য অবস্থায় থাকে, তার উপর পুরুষের প্রভাব পড়লে বৈষম্য তৈরি হয় আর গুণের সমাবেশে বিবিধ রচনা হতে থাকে | এই তিন গুণের মধ্যে সতোগুন হল জ্ঞান আর প্রকাশের প্রতীক , তমগুণ হল অজ্ঞান আর অন্ধকারের প্রতীক আবার রাজো গুণ হল তৃষ্ণা, আসক্তি ও ক্রিয়াশীলতার প্রতীক | মানুষ এই তিন গুণের দ্বারাই প্রভাবিত, অভ্যাসের বলে সে রজো আর তমো গুণ কে নিজ নিয়য়ন্ত্রণে রেখে সত্ব গুণের বলে অনন্ত সুখ পাওয়ার দিকে সচেষ্ট হয় |
ঔঁ তত্সত : উপনিষদ থেকে উদ্ভূত এই শব্দ কে সৃষ্টির আদি নাদ হিসেবেও দেখা হয় | সৃষ্টির উত্পত্তি যে স্ফুরণে হয়েছে তার ঘোষ ধ্বনি হল এই প্রণব মন্ত্র ঔঁ | এটি সত স্বরূপী পরামাত্মার প্রতীক নাদ- ব্রাহ্ম | প্রকৃত পক্ষে ঔঁ ব্রহ্ম ও পরম | নির্গুন ও নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার মুখ্য অংশ হিসেবেও ঔঁ পরিগণিত | "অক্ষর ঔঁ ই ব্রাহ্ম, ঔঁ ই পরম |" (কঠ উপনিষদ )
কিন্তু ঔঁ ব্রহ্মের সাধন রূপ ও পরমাত্মার নির্গুন সাধনায় ঔঁ হল একটি সর্ব শ্রেষ্ঠ সাধন | কঠ উপনিষদে বলা হয়েছে যে যে ভাবেই অক্ষর ব্রহ্মের সাহায্যে পরামাত্মার উপাসনা করে তাকে সেই রূপ ফল ঈশ্বর দিয়ে থাকেন | একাক্ষরী মানা হলেও প্রকৃত পক্ষে ঔঁ তিন অক্ষরের সমন্বয়ে তৈরি ; এই তিন অক্ষর হল অ, ও আর ম |" এই তিন অক্ষরের সমন্বয়ে নির্মিত ঔঁ ব্রহ্ম জগত ও জীব জগতের ব্যঞ্জক | মানুষের ভিতর অবস্থানকারী সমস্ত অংশ কে জুড়ে দিতে পারে বলে ঔঁ কে পূর্ণানন্দের অন্তর ধ্বনি ও বলা হয় | তত্ এর অর্থ হল ব্রহ্ম আর সত্ এর অর্থ হল - নিত্য ও শাশ্বত | ঔঁ তত সত্ এর অর্থ হল ব্রহ্ম সত্য, শাশ্বত ও নিত্য | এই কারণে যজ্ঞ , দান আদি কাজ ঔঁ তত্ সত্ দিয়েই শুরু হয় |
সন্যাস ও ত্যাগ : লোক মান্য অর্থে সন্যাস হল সব কর্মের ত্যাগ | ভারতীয় বিধানে মুখ্য ও গৌণ - এই দুই প্রকার সন্যাস হয় | মুখ্য সন্যাস আবার দুই প্রকার: বিদ্বত সন্যাস ও বিবিদিষা সন্যাস | জ্ঞানের অন্তিম অবস্থায় সর্ব কর্ম ত্যাগ হলে বিদ্বত সন্যাস আবার চিত্ত শুদ্ধি হবার পর আত্ম অধ্যয়নের জন্য হলে বিবিদিষা সন্যাস পরিগণিত হবে | অন্য দিকে কর্ম ফল ত্যাগ কে ই গৌণ সন্যাস মানা হয় | গীতা তে মুখ্য সন্যাসের প্রয়োজনীয়তা বা শ্রেষ্ঠত্ব কে অস্বীকার করে নি তবে কর্ম ফল ত্যাগের মাধ্যামে প্রাপ্ত গৌণ সন্যাস কে বেশি জরুরী মনে করা হয়েছে | তাই গীতা তে সর্ব কর্ম ত্যাগের গুরুত্ব না থেকে কর্ম ফল ত্যাগের গুরুত্ব বেশি | কাম্য কর্ম বলতে লৌকিক ইচ্ছার জন্য কৃত কর্ম কেই বোঝাবে | এই কর্ম ফল ত্যাগ কেই গীতা সন্যাস আখ্যা দিয়ে থাকে | গীতা সর্বকর্মফল ত্যাগ কে ত্যাগ ও কাম্য কর্ম ত্যাগ কে সন্যাস বলে |
জ্ঞান : উপনিষদ ও ব্রাহ্মসূত্রের জ্ঞান হল ব্রাহ্ম বিদ্যা ও আত্মবিদ্যা | গীতা মতে অহিংসা, ক্ষমা, সরলতা , আত্ম সংযম , প্রিয়- অপ্রিয সমভাব, অনন্য ভক্তি, বৈরাগ্য, আনাসাক্তি আদি সদ বৃত্তি জ্ঞানের পরিধিতে আসে | এই সমস্ত সদ বৃত্তি গুলি গীতার ষোড়স অধ্যায়ে দৈব সম্পদ হিসেবে পরিগণিত করা হয়েছে | গীতার জ্ঞানবান (স্থিতপ্রজ্ঞ,যোগী, ভক্ত, গুনাতীত ও ব্রহ্মনিষ্ঠ )পুরুষ তাই সমাজ, জগত ও জীবন থেকে আলাদা কেও নয় | তাই গীতা মতে কর্মযোগী, জ্ঞাননিষ্ঠ সন্যাসী ও ভক্ত পরিশেষে একই দিব্য পথের পথিক হয়ে থাকেন |
(৩) মহাভারত কথা প্রসঙ্গ
গীতোপদেশ সরাসরি মহাভারতের সাথে যুক্ত , তাই মুখ্য বিষয়ে যাবার আগে সেই পটভূমি বুঝে নেওয়া দরকার | আমরা স্বর্গের অষ্ট বসুর কথা শুনেছি | একবার তাঁরা ঋষি বশিষ্টের আশ্রম দেখতে মর্ত্য লোকে এসে তাঁর কামধেনু গাভিটির উপর বিশেষ অনুরক্ত হয়ে তাকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য আগ্রহী হন | ঋষি আশ্রমে অনুপস্থিত থাকায় তাঁরা তা করে উঠতে পারছিলেন না | কনিষ্ঠ বসু গাভিটির উপর বেশি অনুরক্ত হয়ে বাকি বাসুদের রাজী করিয়ে নেন | ঋষি নিজের আশ্রমে এসে দিব্য দৃষ্টি দিয়ে সব বুঝতে পেরে যান আর বসুদের মর্ত্যে জন্ম নেউয়ার জন্য অভিশপ্ত করেন | বসুরা এইসব কথা তে বিচলিত হয়ে ঋষির নিকট ক্ষমা যাচনা করেন | মুনি বললেন , "যদি মর্ত্য লোকে তোমাদের এমন মাঁ মেলে যে জন্মের সাথে সাথে তাদের জীবন লীলা শেষ করতে পারে তাহলে প্রথম সাত বসু তো স্বর্গে ফিরতে পারবেন , অষ্টম জন কে মর্ত্য লোকে থাকতে হবে | বসুরা গঙ্গার কাছে আকুতি জানালে গঙ্গা তাদের মাঁ হতে রাজী হলেন |
এদিকে রাজা শান্তনু গঙ্গা তীরে ভ্রমণ করছিলেন, সেই সময় এক সুন্দরী নারীর মোহে পড়েন | ওই সুন্দরী নারী রূপে গঙ্গাই ছিলেন | তিনি এই শর্তে শান্তনুর সাথে বিয়ে করতে রাজী হলেন যে তিনি তাঁর সন্তানের সহিত যেমন খুশি ব্যাবহার করবেন আর তাতে রাজা বাধা দেবেন না| প্রথম সাত পুত্র রত্ন কে গঙ্গা নিজ ধারায় ভাসিয়ে দিলেন | অষ্টম পুত্রের বেলায় শান্তনু দৃঢ হয়ে তাকে ভাসিয়ে দেওয়া থেকে গঙ্গা কে প্রতিহত করলেন | গঙ্গা অষ্ট বসুদের কথা শান্তনু কে বলে বিদায় নিলেন | সেই অষ্টম পুত্রের নাম রাখা হল দেব ব্রত |
শান্তনু আর একবার এক মেছুআর কন্যার প্রতি অনুরক্ত হন | তাঁর বিবাহ প্রস্তাব এই বলে ফেরানো হয় যে তাঁর আগে থেকেই একটি সন্তান আছে অতএব সেই রাজ সিংহাসনের অধিকার দাবী কারবে | তাই এই পরিস্থিতি তে দ্বিতীয় বিবাহ প্রস্তাবে রাজী হোওয়া সম্ভব নয় | রাজা এই বিষয়ে দুঃখী থাকতে লাগলেন | দেব ব্রত নিজের বাবার মনস্থিতি বুঝতে পেরে সেই মেছুয়া পরিবারের সাথে দেখা করে তাঁর উত্তরাধিকার ছেড়ে দেবার কথা বলে বিবাহ প্রস্তাবে রাজী করিয়ে নেন | দেবব্রত সারা জীবন বিবাহ না করার ভীষণ শপথ নিয়েছিল বলে তার নাম ভীষ্ম পড়লো |
শান্তনুর সাথে সত্যবতির বিয়ে হয়, আর তাদের দুই পুত্রের নাম হল- চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্র বীর্য | সেই দুই সন্তানের বিয়ে হলেও জন্মজাত সমস্যার কারণে নিঃসন্তান থাকলেন , অকালে মারাও গেলেন | ভীষ্ম বিবাহে রাজী না হবার ফলে সত্যবতীর দুই বিধবা পুত্রবধূ কে নিয়োগ প্রক্রিয়া তে সন্তান কারানো হয় ; এই ভাবে জন্ম হয় ধৃতরাষ্ট্র আর পান্ডুর | ধৃতরাষ্ট্র জনমান্ধ থাকায় পাণ্ডু রাজ সিংহাসনে বসেন ; তাঁর পাঁচ পুত্র হলেন : যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব | অন্য দিকে ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্রের মধ্যে দুর্জোধন বড় ছিলেন | এই সমস্ত রাজ কুমার দের শিক্ষা দীক্ষার ভার পড়লো গুরু দ্রোণাচার্যের উপর | তিনি পাণ্ডু পুত্র দের বেশি পছন্দ . কারতে লাগলেন | ওদের মধ্যে অর্জুন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হিসেবে নিজেকে প্রমাণিত কারতে পেরেছিলেন | পাণ্ডু রোগে জর্জরিত হবার জন্য পাণ্ডুর অকাল মৃত্যু হয় আর ধৃত রাষ্ট্র রাজা হন |
দুর্জোধন পাণ্ডব দের সাথে ইর্শ্যা . করতো | দুর্যোধন ওদের কে লাক্ষা গৃহে ঢুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলো | তারা বেঁচে যায়, কিন্তু দুর্যোধনের মনে হয় পাণ্ডব রা মারা গিয়েছেন |
এদিকে রাজা দ্রুপদ তাঁর কন্যা দ্রৌপদীর জন্য এক স্বয়মবর সভার আয়োজন করেন | এতে শর্ত রাখা হয়েছিল যে জলে ছায়া দেখে এক মাছের চোখের মণি ভেদ করতে হবে | চেষ্টা অনেকে কারলেও পরিশেষে সাফল্য অর্জুনের হাতে লাগে ; মায়ের আদেশনুসারে পাঁচ ভাই দ্রৌপদীর সাথে বিয়ে করেন |
পাণ্ডবরা জীবিত এই খবর পেয়ে আর ভীষ্ম ও বিদূরের রায় মেনে তাদের ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেউয়া হয় | ইন্দ্রপ্রস্তের রাজ সিংহাসন তাদের দেওয়া হয় | যুধিষ্ঠিরের রাজসুয় যজ্ঞে দুর্যোধন অপমানিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র করেন | যুধিষ্ঠির কে পাশা খেলায় নিমন্ত্রিত করা হয় | যুধিষ্ঠির নিজের রাজ্য, সম্পত্তি এমনকি ভাই দের ও বাজি তে রাখলেন আর ক্রমাগত শকুনীর প্রতি চালাকির চালে মাত্ হতে লাগলেন | দ্রৌপদী কে তাদের গুরুজন দের সামনেই অপমানিত কারা হয়, কৃষ্ণ ক্রিপা তে তার লজ্জা বেঁচেছিল | এখানেই মহাভারতের যুদ্ধের বীজ পোঁতা হয়ে যায় | পাণ্ডব দের তের বছরের বনবাস আর এক বছরের অজ্ঞাত বাস হয় | তেরো বছরের পরে পাণ্ডব রা রাজা বিরাট এর কাছে ছদ্মবেশে থাকতে লাগলেন | দুর্জোধনের কাছে এই মর্মে খবর আসে, সন্দিহান দুর্জোধন বিরাট রাজ্য আক্রমণ করেন আর বিরাট রাজ্যের পক্ষে লড়াইএ অংশ গ্রহণকারী পাণ্ডব দের কাছে হেরে যান | ওদের দুর্জোধন চিনতে পেরে যান কিন্তু তত দিনে তাদের অজ্ঞাত বাস পূরো হয়ে গিয়েছিল |
পাণ্ডবরা খবর পাঠায় যে যদি তাদেরকে পাঁচটা গ্রাম ও ফেরানো হয় তাহলে তাঁরা রাজ্যের দাবী ছেড়ে দেবেন | জিদ্দি আর দাম্ভিক দুর্জোধন শুচিকাগ্র জমি ও দিতে রাজী হয় নি | কৃষ্ণ শান্তি প্রস্তাব নিয়ে গিয়ে বিফল হয়ে ফেরেন |দুর্জোধন তাঁর ওপর ও হামলায় উদ্ধত হয় | ফলশ্রুতি হিসেবে পরিশেষে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবি হয়ে ওঠে |
কৃষ্ণ এই যুদ্ধে তটস্থ থাকতে চাইছিলেন, তাই ঠিক করলেন যে এই যুদ্ধে তিনি এক দিকে থাকবেন কিন্তু অস্ত্র ধরবেন না, অন্য দিকে তাঁর পুরো সেনা বাহিনী থাকবে | দুর্জোধন সেনা বেছে নিল আর কৃষ্ণ অর্জুনের সখা সারথী হয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন |
পাণ্ডব - কৌরব সেনা কুরুক্ষেত্রের মাঠে পরস্পর মুখোমুখি এসে গেল | বাকি রইল শুধু শঙ্খানাদের |
(৪) অর্জুনের ধর্ম সংকটের ব্যাপক পটভূমি
গীতা র ভৌতিক পটভূমি হল দুই যুদ্ধ লোলুপ সেনা পরস্পরের উপর হামলা কারার জন্য যুদ্ধের মাঠে অপেক্ষমান | এর বৈচারিক পটভূমি হল অর্জুনের বিষাদ ও মতিভ্রমের পরিস্থিতি, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় তা ঠিক কারতে না পারার পরিস্থিতি | নিজের বিপক্ষে আত্মীয় , স্বজন, গুরুজন দের যুদ্ধ ভূমি তে দেখে অর্জুন ধর্ম সংকটে পড়ে যায়; সে ঠিক কারতে [পারে না যে কেবল রাজ্য পাবার জন্য এদের কে হত্যা করা কতোটা সমীচীন হবে | যুদ্ধ না করার পক্ষে তর্ক দিতে গিয়ে অর্জুন তার সমর্থনে পর পর অনেকগুলি পরিস্থিতি কৃষ্ণ কে বললেন | প্রথমত, যুদ্ধে বংশ ও তার ধর্ম নষ্ট হবে, চারিদিকে অরাজকতার পরিস্তিতি তৈরি হবে , বংশের স্ত্রী রা কূলটা হয়ে বর্ণ সংকর সন্তানের জন্ম দেবেন আর এই ভাবে পূর্ব পুরুষদের অধোগতি হবে | উত্তেজিত অবস্থায় অর্জুন বলতে লাগলেন, তিনি চান ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা যেন তাঁকে মেরে ফেলেন, তিনি গুরু হত্যার পাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চান, এই বলে গান্ডীব ফেলে দিলেন আর রথে এসে বসে পড়লেন |
কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের বিষাদের এক ব্যাপক গুরুত্ব আছে; এই বিষাদ বৈচারিক ও আধ্যাত্মিক উত্প্রেরক প্রস্তুত করে | তাঁর মোহই আমাদের সামনে প্রশ্ন আকারে আসতে থাকে |
গীতা জ্ঞানের বীজ ওই প্রশ্ন সমূহের মধ্যেই নিহিত আছে | অর্জুনের মোহ প্রত্যেক কাল খন্ডে যে কোনো কর্ম চঞ্চল , দায়িত্বশীল ব্যক্তির মোহ হতে পারে | তাই বলা যেতে পারে যে, যে কোনো কাল খন্ডেই গীতোপদেশ বাস্তবোচিত ও প্রাসঙ্গিক |
আরও একটি বিষয় লক্ষ করা যায়, অর্জুন যে সমস্ত প্রশ্ন কৃষ্ণ র কাছে গীতা র প্রথম অধ্যায়ে রেখেছেন সেই প্রশ্ন গুলি পুনরায় দ্বিতীয় অধ্যায়ে উপস্থাপিত হয়েছে | কৃষ্ণ তাহলে প্রথম অধ্যায়ে অর্জুনের শঙ্কা সমাধান করলেন না কেন ? প্রকৃত পক্ষে প্রথম অধ্যায়ে অর্জুনের মনস্থিতি আর দ্বিতীয় অধ্যায়ে তার ছাত্র সুলভ জিজ্ঞাসা বৃত্তির মধ্যে বিস্তর তফাত আছে | প্রথম অধ্যায়ে অর্জুন কিং কর্তব্য বিমূঢ় ছিলেন, আর দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি কিং কুশলান্বেষণ কারী হলেন |
অর্জুনের মনোভাবের এহেন পরিবর্তন আমাদের কাছে গুরুত্ব পূর্ণ | আমাদের মনে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, বিনম্রতা ও আস্থা জন্মালেই মোহ আর শঙ্কা নিবারণ সম্ভব | কুশলান্বেষকের ভূমিকায় না আসা পর্যন্ত আমরা কোনো সমস্যার সমাধান সূত্র সহজে পাবো না | গীতা তে বর্ণিত কৃষ্ণ -অর্জুন সংবাদের মাধ্যামে বলা যেতে পারে , "হে অর্জুন , তত্ববিদকে শ্রদ্ধা পূর্বক প্রণাম করে বিনম্রতা সহকারে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তার সঠিক সমাধান পাওয়া যায় | "(IV:34)
শ্রদ্ধা যুক্ত হবার সাথে সাথে আমাদের জ্ঞানান্বেষনের অবসর খুঁজে নিতে হবে আর সে বিষয়ে কাজ ও করতে হবে | জ্ঞান অর্জনের চারটি সাধন আমাদের মনে রাখতে হবে :" প্রথম চতুর্থাংশ আমরা আচার্য দের নিকট পাই, দ্বিতীয় চতুর্থাংশ মেধাবলে পাই, তৃতীয় চতুর্থাংশ সহপাঠি দের সাথে বাক্যালাপ করে পাই , চতুর্থ অংশ ব্যক্তি কালক্রমে অনুভব থেকে শিক্ষা পায় |
গীতা র প্রতিটি অংশ , প্রতিটি কথা শিক্ষা প্রদ হয়ে পাঠকের মনে উত্পন্ন শঙ্কা নিরসন করে ; নিজেকে জানতে , সমাজে নিজের ভূমিকা বুঝে নিতে ও সেই মতো দায়িত্ব পালনে অগ্রসর হতে প্রতি পদে সাহায্য করে | গীতা কে তাই আমাদের জীবন মন্ট্রে পরিপূর্ণ এক পাথেয় বলা কোনো ভাবেই ভূল হবে না |